স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার উত্তরাধিকার অংশ, বাবার ভাই-বোনের অধিকার, জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিধান ও কালো জাদুর শরীয়তসম্মত প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7116
Questioner: Sumaiya Bintay
Question Asked: 19 Oct 2026, 08:05 PM
Reviewed & Published: 19 Oct 2026, 09:17 PM
Views: 12
Tokens: 6,178
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আমার বাবার একটাই মেয়ে, আমার বাবা মা আলহামদুলিল্লাহ বেঁচে আছে, আমার বাবার মা-বাবা নেই ,কিন্তু তার চার ভাই ও তিন বোন বেঁচে আছেন, যেহেতু আমার বাবার কোনো ছেলে নেই তাই আমার বাবার ভাই এরা জমিজমার লোভে আমার ওপর এবং আমার বাবা-মায়ের উপর কালো জাদু করেছে যাতে আমরা মারা যাই এবং তারা আমাদের সম্পদ গুলো ভোগ করতে পারে, শুধুমাত্র সম্পদের লোভে তারা আমাকে দিয়ে তাদের ছেলেকে বিয়ে দিতে চায়, বাহ্যিকভাবে তারা আমাদেরকে দেখতে পারেনা এবং সহ্য করতে পারে না,, এখন আমার কথা হলো আমরা কিভাবে সম্পদ বন্টন করবো? আমি কতটুকু ভাগ পাবো এবং আমার মা আমার বাবার স্ত্রী হিসেবে কতটুকু পাবে,, আর তার ভাইয়েরা কি সম্পদ পাবে যেহেতু তারা আমাদের উপর কুফুরি করছে আমরা যদি তাদেরকে না দেই আর আমার বাবা যদি সব জমি জমা আমার এবং আমার মায়ের নামে লিখে দেয় তাহলে কি গুনাহ হবে?

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

বোন, আপনার এবং আপনার বাবা-মায়ের প্রতি আত্মীয়দের শত্রুতামূলক আচরণ ও হয়রানির কথা শুনে সমবেদনা প্রকাশ করছি। কালো জাদু, কুফুরি ও অন্যায্য উপায়ে সম্পদ দখলের চেষ্টা ইসলামে অকাট্য হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে সব ধরণের ক্ষতি ও শত্রুতামূলক তৎপরতা থেকে হেফাজতে রাখুন।


১. মীরাছ/ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পদের বণ্টন (পিতা মৃত্যুবরণ করলে):

যদি আপনার পিতা বর্তমানে জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পদ বণ্টন বা হিবাহ না করে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর ত্যাজ্য সম্পত্তি (মিরাস) থেকে তাঁর ১ স্ত্রী, ১ কন্যা এবং ৪ ভাই ও ৩ বোনের মাঝে শরীয়তসম্মত বণ্টন নিম্নরূপ হবে:

  • ক) স্ত্রীর অংশ (আপনার মায়ের ভাগ):
    যেহেতু আপনার পিতার সন্তান (আপনি) রয়েছেন, তাই আপনার মা (পিতার স্ত্রী) মোট ত্যাজ্য সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ ভাগ (১/৮ বা ১২.৫%) পাবেন।
    (দলিল: সূরা নিসা: ১২; সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৩৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)।

  • খ) আপনার অংশ (একমাত্র কন্যার ভাগ):
    যেহেতু আপনার পিতা-মাতার আপনি একমাত্র কন্যা এবং কোনো ভাই (পিতার ছেলে) নেই, তাই ফারায়েজ অনুযায়ী আপনি মোট সম্পত্তির অর্ধেক বা ২ ভাগের ১ ভাগ (১/২ বা ৫০%) পাবেন।
    (দলিল: সূরা নিসা: ১১; সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৩৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)।

  • গ) চাচা ও ফুফুদের অংশ (৪ ভাই ও ৩ বোন):
    স্ত্রী (১/৮) ও কন্যা (১/২) তাঁদের নির্দিষ্ট অংশ নেওয়ার পর অবশিষ্ট থাকে মোট সম্পত্তির ৮ ভাগের ৩ ভাগ (৩/৮ বা ৩৭.৫%)।
    পিতার কোনো ছেলে সন্তান বা পিতা-দাদা জীবিত না থাকায়, এই অবশিষ্ট ৩৭.৫% সম্পদ আপনার পিতার ৪ ভাই ও ৩ বোন 'আসাবা' (অবশিষ্টাংশভোগী) হিসেবে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী (১ ভাই = ২ বোনের অংশ) নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেবে।
    (দলিল: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)।


২. আপনার পিতা জীবদ্দশায় সমস্ত সম্পদ আপনার ও আপনার মায়ের নামে লিখে (হিবাহ করে) দিলে কি গুনাহ হবে?

  • শরয়ী ফায়সালা:
    সাধারণ অবস্থায় কোনো ওয়ারিশকে পুরোপুরি বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় সব সম্পদ লিখে দেওয়া অপছন্দনীয়। কিন্তু বিশেষ ও জরুরি ওজরের কারণে (যেমন: আত্মীয়দের অন্যায় শত্রুতা, কালো জাদু/কুফুরির মাধ্যমে ক্ষতি করার চেষ্টা, বা পিতার মৃত্যুর পর অসহায় স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে সম্পদহীন করে কষ্ট দেওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকলে) পিতা যদি তাঁর সুস্থ মস্তিষ্কে জীবিত থাকাকালে সমস্ত বা অধিকাংশ সম্পত্তি তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার নামে রেজিস্ট্রি/দান (হিবাহ) করে দেন এবং পূর্ণ দখল (ক্ববজা) বুঝিয়ে দেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে বৈধ (সহীহ) হবে এবং এতে পিতার কোনো গুনাহ হবে না ।

  • ফিকহী কারণ ও প্রামাণ্য বিশ্লেষণ:
    ১. জীবদ্দশায় স্বত্বাধিকার: একজন ব্যক্তি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাঁর নিজস্ব ধন-সম্পত্তির পূর্ণ মালিক ও স্বত্বাধিকারী। তিনি জীবদ্দশায় যাকে ইচ্ছা তা দান করতে পারেন।
    ২. হিবাহ তামাম হওয়া: পিতা যদি জীবদ্দশায় জমি-জমা আপনার ও আপনার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন এবং তার দখল ও তদারকি আপনাদের বুঝিয়ে দেন, তবে উক্ত সম্পদের ওপর আপনাদের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। পিতার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পদ আর 'মিরাস' বা ত্যাজ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না; ফলে চাচা-ফুফুরা তাতে কোনো অংশ দাবি করতে পারবে না।
    ৩. ক্ষতি থেকে সুরক্ষার নিয়ত: ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, ওয়ারিশদের জুলুম বা অপকারিতা থেকে স্বীয় সন্তান ও স্ত্রীকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় হিবাহ করলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হয় না।


৩. আপনাদের জন্য করণীয় ও পরামর্শ:

১. আইনি ও শরয়ী পদক্ষেপ: আপনার পিতা চাইলে বর্তমানে সুস্থ থাকতেই জমি-জমা বা স্থাবর সম্পত্তি আপনার ও আপনার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি বা দানপত্র (হিবাহ) দলিল করে পূর্ণ দখল বুঝিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনারা শরীয়ত ও আইনগতভাবে সুরক্ষাকবচ পাবেন।
২. কালো জাদু ও কুফুরি থেকে হেফাজতের আমল:

  • প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ৩ বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে শরীরে ও ঘরে ফুঁ দেবেন।
  • আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত নিয়মিত পাঠ করবেন।
  • হাদীসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করবেন:

    «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ»
    (অর্থ: "আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাক্যসমূহের ওসীলায় তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।")।


সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. সিরাজী ফিল মিরাস:

  • পৃষ্ঠা: ১৩৫ (অধ্যায়: আসহাবুল ফুরূজ ও আসাবা): (একমাত্র কন্যার জন্য ১/২, স্ত্রীর জন্য ১/৮ এবং অবশিষ্টাংশ আসাবার মাঝে বণ্টনের ফিকহী বিবরণ)।

২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:

  • ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯ (কিতাবুল ফারায়েজ): (কন্যা, স্ত্রী ও আসাবা ভাই-বোনদের মিরাসের সুনির্দিষ্ট অংশের বিবরণ)।
  • ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯১ (কিতাবুল হিবাহ, ১ম অনুচ্ছেদ): (সুস্থ অবস্থায় স্বীয় সম্পদ দান করা ও দখল হস্তান্তরের ফিকহী শর্তাবলী)।

৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:

  • ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৮ & ১৮৫ (কিতাবুল ফারায়েজ): (আসাবার পরিচয় এবং কন্যা ও স্ত্রীর উপস্থিতিতে ভাই-বোনদের অংশ পাওয়ার মাসআলা)।
  • ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬২, ৭৩ & ৯৩ (কিতাবুল হিবাহ): (বিশেষ প্রয়োজনে বা জুলুম/ক্ষতি থেকে রক্ষার্থে সুস্থ অবস্থায় জীবদ্দশায় সম্পত্তি কন্যা ও স্ত্রীকে হিবাহ করার শরয়ী বৈধতা ও গুনাহ না হওয়ার ফতোয়া)।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.