স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার উত্তরাধিকার অংশ, বাবার ভাই-বোনের অধিকার, জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিধান ও কালো জাদুর শরীয়তসম্মত প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বোন, আপনার এবং আপনার বাবা-মায়ের প্রতি আত্মীয়দের শত্রুতামূলক আচরণ ও হয়রানির কথা শুনে সমবেদনা প্রকাশ করছি। কালো জাদু, কুফুরি ও অন্যায্য উপায়ে সম্পদ দখলের চেষ্টা ইসলামে অকাট্য হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে সব ধরণের ক্ষতি ও শত্রুতামূলক তৎপরতা থেকে হেফাজতে রাখুন।
১. মীরাছ/ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পদের বণ্টন (পিতা মৃত্যুবরণ করলে):
যদি আপনার পিতা বর্তমানে জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পদ বণ্টন বা হিবাহ না করে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর ত্যাজ্য সম্পত্তি (মিরাস) থেকে তাঁর ১ স্ত্রী, ১ কন্যা এবং ৪ ভাই ও ৩ বোনের মাঝে শরীয়তসম্মত বণ্টন নিম্নরূপ হবে:
-
ক) স্ত্রীর অংশ (আপনার মায়ের ভাগ):
যেহেতু আপনার পিতার সন্তান (আপনি) রয়েছেন, তাই আপনার মা (পিতার স্ত্রী) মোট ত্যাজ্য সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ ভাগ (১/৮ বা ১২.৫%) পাবেন।
(দলিল: সূরা নিসা: ১২; সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৩৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)। -
খ) আপনার অংশ (একমাত্র কন্যার ভাগ):
যেহেতু আপনার পিতা-মাতার আপনি একমাত্র কন্যা এবং কোনো ভাই (পিতার ছেলে) নেই, তাই ফারায়েজ অনুযায়ী আপনি মোট সম্পত্তির অর্ধেক বা ২ ভাগের ১ ভাগ (১/২ বা ৫০%) পাবেন।
(দলিল: সূরা নিসা: ১১; সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৩৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)। -
গ) চাচা ও ফুফুদের অংশ (৪ ভাই ও ৩ বোন):
স্ত্রী (১/৮) ও কন্যা (১/২) তাঁদের নির্দিষ্ট অংশ নেওয়ার পর অবশিষ্ট থাকে মোট সম্পত্তির ৮ ভাগের ৩ ভাগ (৩/৮ বা ৩৭.৫%)।
পিতার কোনো ছেলে সন্তান বা পিতা-দাদা জীবিত না থাকায়, এই অবশিষ্ট ৩৭.৫% সম্পদ আপনার পিতার ৪ ভাই ও ৩ বোন 'আসাবা' (অবশিষ্টাংশভোগী) হিসেবে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী (১ ভাই = ২ বোনের অংশ) নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেবে।
(দলিল: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯)।
২. আপনার পিতা জীবদ্দশায় সমস্ত সম্পদ আপনার ও আপনার মায়ের নামে লিখে (হিবাহ করে) দিলে কি গুনাহ হবে?
-
শরয়ী ফায়সালা:
সাধারণ অবস্থায় কোনো ওয়ারিশকে পুরোপুরি বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় সব সম্পদ লিখে দেওয়া অপছন্দনীয়। কিন্তু বিশেষ ও জরুরি ওজরের কারণে (যেমন: আত্মীয়দের অন্যায় শত্রুতা, কালো জাদু/কুফুরির মাধ্যমে ক্ষতি করার চেষ্টা, বা পিতার মৃত্যুর পর অসহায় স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে সম্পদহীন করে কষ্ট দেওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকলে) পিতা যদি তাঁর সুস্থ মস্তিষ্কে জীবিত থাকাকালে সমস্ত বা অধিকাংশ সম্পত্তি তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার নামে রেজিস্ট্রি/দান (হিবাহ) করে দেন এবং পূর্ণ দখল (ক্ববজা) বুঝিয়ে দেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে বৈধ (সহীহ) হবে এবং এতে পিতার কোনো গুনাহ হবে না । -
ফিকহী কারণ ও প্রামাণ্য বিশ্লেষণ:
১. জীবদ্দশায় স্বত্বাধিকার: একজন ব্যক্তি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাঁর নিজস্ব ধন-সম্পত্তির পূর্ণ মালিক ও স্বত্বাধিকারী। তিনি জীবদ্দশায় যাকে ইচ্ছা তা দান করতে পারেন।
২. হিবাহ তামাম হওয়া: পিতা যদি জীবদ্দশায় জমি-জমা আপনার ও আপনার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন এবং তার দখল ও তদারকি আপনাদের বুঝিয়ে দেন, তবে উক্ত সম্পদের ওপর আপনাদের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। পিতার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পদ আর 'মিরাস' বা ত্যাজ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না; ফলে চাচা-ফুফুরা তাতে কোনো অংশ দাবি করতে পারবে না।
৩. ক্ষতি থেকে সুরক্ষার নিয়ত: ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, ওয়ারিশদের জুলুম বা অপকারিতা থেকে স্বীয় সন্তান ও স্ত্রীকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় হিবাহ করলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হয় না।
৩. আপনাদের জন্য করণীয় ও পরামর্শ:
১. আইনি ও শরয়ী পদক্ষেপ: আপনার পিতা চাইলে বর্তমানে সুস্থ থাকতেই জমি-জমা বা স্থাবর সম্পত্তি আপনার ও আপনার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি বা দানপত্র (হিবাহ) দলিল করে পূর্ণ দখল বুঝিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনারা শরীয়ত ও আইনগতভাবে সুরক্ষাকবচ পাবেন।
২. কালো জাদু ও কুফুরি থেকে হেফাজতের আমল:
- প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ৩ বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে শরীরে ও ঘরে ফুঁ দেবেন।
- আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত নিয়মিত পাঠ করবেন।
- হাদীসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করবেন:
«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ»
(অর্থ: "আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাক্যসমূহের ওসীলায় তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।")।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. সিরাজী ফিল মিরাস:
- পৃষ্ঠা: ১৩৫ (অধ্যায়: আসহাবুল ফুরূজ ও আসাবা): (একমাত্র কন্যার জন্য ১/২, স্ত্রীর জন্য ১/৮ এবং অবশিষ্টাংশ আসাবার মাঝে বণ্টনের ফিকহী বিবরণ)।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:
- ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯ (কিতাবুল ফারায়েজ): (কন্যা, স্ত্রী ও আসাবা ভাই-বোনদের মিরাসের সুনির্দিষ্ট অংশের বিবরণ)।
- ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯১ (কিতাবুল হিবাহ, ১ম অনুচ্ছেদ): (সুস্থ অবস্থায় স্বীয় সম্পদ দান করা ও দখল হস্তান্তরের ফিকহী শর্তাবলী)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৮ & ১৮৫ (কিতাবুল ফারায়েজ): (আসাবার পরিচয় এবং কন্যা ও স্ত্রীর উপস্থিতিতে ভাই-বোনদের অংশ পাওয়ার মাসআলা)।
- ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬২, ৭৩ & ৯৩ (কিতাবুল হিবাহ): (বিশেষ প্রয়োজনে বা জুলুম/ক্ষতি থেকে রক্ষার্থে সুস্থ অবস্থায় জীবদ্দশায় সম্পত্তি কন্যা ও স্ত্রীকে হিবাহ করার শরয়ী বৈধতা ও গুনাহ না হওয়ার ফতোয়া)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।