ওষুধি গাছের শিকড় তাবিজের ভেতরে ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে রাখা কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7039
Questioner: Monira Nisaa
Question Asked: 17 Oct 2026, 08:41 PM
Reviewed & Published: 17 Oct 2026, 10:06 PM
Views: 20
Tokens: 3,544
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।
আমার পরিচিত একজনের প্রায়ই জ্বর আসে। এজন্য তাকে একটা তাবিজের ভিতর কিছু ওষুধি গাছের শিকড়বাকড় ঢুকিয়ে সেই তাবিজটি পরে রাখতে বলা হয়েছে। শিকড় গুলো এমনিতে পরে রাখা যায়না বিধায় তাবিজের ভিতর ঢুকিয়ে পরে রাখতে বলেছে। এটা কি জায়েজ?

Answer

উত্তর (ফতোয়া নং: 7039)

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নে উল্লেখিত পদ্ধতিতে ওষুধি গাছের শিকড়-বাকড় তাবিজের ভেতরে ঢুকিয়ে গলায় বা শরীরে ঝুলিয়ে রাখা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ, তবে এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মানতে হবে। শুধু ওষুধি গাছের শিকড় রাখা নিজে থেকে হারাম নয়; বরং এটি চিকিৎসার একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য। কিন্তু তাবিজের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় আছে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে অবশ্যই লক্ষণীয়।


১. তাবিজ ব্যবহারের মূল বিধান

হাদিসে তাবিজ ব্যবহারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে শিরক-কুফরি ও অশুদ্ধ আকিদার ক্ষেত্রে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ» — যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলাল, সে শিরক করল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৪২২; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৫১৬ — সহিহ সনদে)

তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা দুআ থাকে এবং তা হারাম বা শিরকি কিছু না মিশ্রিত হয়, তাহলে তা জায়েজ। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও অনুরূপ মত দিয়েছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও একটি বর্ণনায় অনুমোদন এসেছে।

দলিল: ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

«وَالْأَصَحُّ أَنَّهُ لَا بَأْسَ بِهِ إِذَا كَانَ فِيهِ الْقُرْآنُ أَوْ أَسْمَاءُ اللَّهِ تَعَالَى» — সঠিক মত হলো, তাবিজে কুরআন বা আল্লাহর নাম থাকলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩ — দারুল ফিকর)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন, তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লিখিত থাকলে এবং শিরকি কিছু না থাকলে তা জায়েজ; তবে তাবিজের ওপর ভরসা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪ — চিকিৎসা অধ্যায়)


২. ওষুধি শিকড় তাবিজে রাখার বিধান

শুধু ওষুধি গাছের শিকড়-বাকড় তাবিজের ভেতরে রাখা এবং তা ঝুলিয়ে রাখা নিজে থেকে নাজায়েজ নয়, কারণ এটি একটি বৈধ চিকিৎসা উপকরণ। তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানতে হবে:

  1. তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকলে তা আরবিতে, পবিত্র অবস্থায় এবং শরীয়তসম্মতভাবে লিখিত হতে হবে। নাপাক কাগজে বা অসম্মানজনকভাবে লেখা যাবে না।
  2. শিরকি বা হারাম কিছু (যেমন: অশ্লীল বাক্য, অজ্ঞাত নাম, জিন-শয়তানের নাম, বেদআতি মন্ত্র) মিশ্রিত থাকা যাবে না।
  3. তাবিজকে স্বয়ংক্রিয় শিফার কারণ মনে করা যাবে না; বরং আল্লাহর হুকুমে মাধ্যম হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

    «وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ» — আর আমি যখন রোগগ্রস্ত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। (সূরা আশ-শুআরা: ৮০)

  4. নাপাক অবস্থায় (যেমন: জানাবাত, হায়েজ-নিফাস) তাবিজ পরা যাবে না, যদি তাতে কুরআনের আয়াত থাকে। ইবনে আবিদিন (রহ.) এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৭৬)
  5. ওষুধি শিকড় ব্যবহারে চিকিৎসাগত উপকারের বিশ্বাস রাখা যাবে, কিন্তু তাতে শিফা দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া কারো নেই — এই আকিদা রাখতে হবে।

৩. বিশেষ সতর্কতা

  • যদি তাবিজটি কোনো পীর-ফকির বা অজ্ঞ ব্যক্তি তৈরি করে থাকে এবং তাতে অজ্ঞাত বাক্য, সংখ্যা বা চিহ্ন থাকে, তবে তা অবশ্যই পরিহার করতে হবে; কারণ তা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
  • ওষুধি শিকড় ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হতে হবে যে তা হারাম বা নাজায়েজ কিছু নয় (যেমন: কোনো নিষিদ্ধ বস্তু বা অশুদ্ধ মন্ত্রপাঠের সাথে সম্পৃক্ত নয়)।
  • জ্বরের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারি পরামর্শ ও বৈধ ওষুধ গ্রহণ করাই উত্তম; তাবিজ বা শিকড়কে একমাত্র ভরসা বানানো যাবে না।

সারসংক্ষেপ

প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে ওষুধি গাছের শিকড় তাবিজের ভেতরে ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে রাখা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ — যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকে, শিরকি কিছু না থাকে, পবিত্রতা রক্ষা করা হয় এবং শিফার প্রকৃত দাতা আল্লাহ তা'আলা — এই আকিদা রাখা হয়। তবে তাবিজকে চিকিৎসার একমাত্র মাধ্যম মনে করা বা অজ্ঞাত-অশুদ্ধ তাবিজ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আপনার পরিচিত ব্যক্তিকে সুস্থতা দান করুন এবং সকলকে শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


তথ্যসূত্র:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ১, পৃ. ৩৪
  • মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৪২২
  • সূরা আশ-শুআরা: ৮০
  • ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ৩ (চিকিৎসা ও তাবিজ অধ্যায়)
  • ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.