নামাজে যাওয়ার আগে বার বার অযু ভেংগে যায়। এ ব্যপারে আমি নিশ্চিত যে অযু নেই কিন্তু পুনরায় করাও র কিছুক্ষন পরেভেংগে যায়। এখেত্রে করনিয় কি?
Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্মরণ করা জরুরি: ইসলামে মূলনীতি হলো, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে অযু ভাঙার কারণ প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ অযু বহাল থাকবে। সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা (মনের অবান্তর চিন্তা) অযু ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়।
১. আপনি কি নিশ্চিত যে অযু ভেঙে যাচ্ছে?
আপনার বক্তব্য: "আমি নিশ্চিত যে অযু নেই" – যদি আপনি প্রকৃতপক্ষে নিশ্চিত হন যে বায়ু নির্গত হয়েছে বা প্রস্রাব-পায়খানার কিছু বের হয়েছে, তাহলে অযু ভেঙে গেছে। কিন্তু যদি শুধু সন্দেহ থাকে (যেমন মনে হয় কিছু বের হলো কি না), তাহলে শরিয়তের নিয়ম হলো: যতক্ষণ না নিশ্চিত হও, অযু ভাঙেনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"إذا وجد أحدكم في بطنه شيئًا، فأشكل عليه: أخرج منه شيء أم لا؟ فلا يخرجن من المسجد حتى يسمع صوتًا أو يجد ريحًا"
(رواه مسلم: 362)
"তোমাদের কেউ যদি পেটে কিছু অনুভব করে, আর সে সন্দেহ করে যে কিছু বের হলো কি না, তবে যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়, ততক্ষণ সে মসজিদ থেকে বের হবে না।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৬২)
সুতরাং: আপনি যদি নিশ্চিত না হন (শুধু অনুভূতি বা ধারণা), তাহলে আপনার অযু ভাঙেনি, এবং আপনি সেই অযু দিয়েই নামাজ পড়তে পারবেন। শয়তান এই ধরনের ওয়াসওয়াসা দিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়।
২. যদি প্রকৃতই বারবার অযু ভেঙে যায় (নির্গত হয়ে থাকে)
এখন ধরা যাক, আপনি নিশ্চিত যে বারবার বায়ু বা অন্য কিছু বের হচ্ছে। তাহলে এটি দুটি অবস্থার হতে পারে:
ক. এটি যদি একটি অবিরাম বা ঘন ঘন সমস্যা হয় (যেমন: প্রস্রাবের অনিয়ম, বায়ু নির্গমনের রোগ, বা অপারেশনের কারণে নিয়মিত বের হওয়া), তাহলে আপনি মাজুর (অপারাধী বা অক্ষম ব্যক্তি) বলে গণ্য হবেন।
আহলে হাদীস ও সালাফী উলামায়ে কেরামের মতে, মাজুর ব্যক্তির জন্য বিধান হলো:
- প্রতিটি ফরয নামাজের জন্য একবার অযু করবেন এবং সেই অযু দিয়ে নামাজের ফরয ও নফল সবকিছু পড়বেন, যতক্ষণ না ওই নামাজের সময় শেষ হয় (অর্থাৎ পরবর্তী নামাজ শুরু হওয়ার আগে)।
- যদি অযু করার পর ওই নামাজের সময়ের মধ্যে আবারও বের হয়, তাহলে সেটি ক্ষমার যোগ্য, এবং অযু ভাঙবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"من به سلس البول أو انفلات الريح أو غيرهما من الحدث الدائم، فإنه يتوضأ لكل صلاة بعد دخول وقتها، ويصلي بذلك الوضوء الفرض والنفل، وما يخرج منه بعد ذلك لا ينقض وضوءه حتى يخرج الوقت"
(مجموع الفتاوى: 21/221)
"যার প্রস্রাব ঝরে বা বায়ু নির্গত হওয়া অবিরাম, বা অন্য কোনো স্থায়ী অপবিত্রতা থাকে, সে প্রতিটি নামাজের জন্য তার সময় হওয়ার পর অযু করবে এবং সেই অযু দিয়ে ফরয ও নফল সব পড়বে। তারপর যা কিছু বের হয়, তা তার অযু ভাঙবে না, যতক্ষণ ওই নামাজের সময় শেষ না হয়।"
একই মত দিয়েছেন শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন, শাইখ সালিহ আল-ফওজান (হাফিযাহুমুল্লাহ) প্রমুখ।
সুতরাং আপনার করণীয়:
- ফরয নামাজের সময় হওয়ার পর (যেমন যোহরের আজানের পর) অযু করুন।
- তারপর ঐ অযু দিয়েই যোহরের ফরয ও সুন্নাত পড়ুন।
- এই অযু যদি ভেঙেও যায় (আপনার রোগের কারণে), তবুও আপনি নামাজ চালিয়ে যাবেন এবং অযু ভাঙবে না।
- পরবর্তী নামাজের সময় শুরু হলে আবার নতুন করে অযু করুন।
খ. যদি এটি স্বাভাবিক বায়ু নির্গমন হয় কিন্তু ঘন ঘন হয় (যেমন প্রতি ৫-১০ মিনিট পর পর), তাহলেও আপনি এই নিয়ম অনুসরণ করবেন। কেননা এটি একটি অস্বাভাবিক অবস্থা যা আপনাকে মাজুর বানিয়ে দেয়।
৩. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়
শাইখ আলবানী (রহ.) এবং অন্য সালাফী উলামাগণ বলেন: ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো একে পাত্তা না দেওয়া এবং নির্দিষ্ট নিয়মে অগ্রসর হওয়া।
- নামাজে যাওয়ার আগে মাসনূন তরীকায় অযু করুন, অযুর পর 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়ুন।
- নামাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
- মনে রাখবেন, শয়তান চায় আপনার নামাজ নষ্ট করতে। আপনি যদি অযু ভাঙা নিয়ে শুধু চিন্তা করতে থাকেন, তাহলে শয়তান জিতে যায়।
৪. গুরুত্বপূর্ণ দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾ [التغابن: 16]
"আল্লাহকে ভয় কর যতটুকু তোমাদের সাধ্য আছে।"
(সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"إذا كان الإنسان في حالة مرضية مستمرة، فإن الله قد رفع عنه الحرج، ويتوضأ لكل صلاة ولا يضره ما يخرج بعد ذلك"
(شرح الممتع: 1/291)
আপনার জন্য সংক্ষিপ্ত সমাধান:
- নিশ্চিত হোন: যদি শুধু সন্দেহ হয়, তবে অযু ভাঙেনি। নামাজ পড়ুন।
- যদি নিশ্চিতভাবে বারবার বায়ু বের হয় (ঘন ঘন): তবে আপনি মাজুর গণ্য। প্রতিটি ফরয নামাজের সময় হওয়ার পর একবার অযু করুন এবং সেই অযু দিয়েই ঐ নামাজের শেষ সময় পর্যন্ত নামাজ পড়ুন।
- ওয়াসওয়াসা দূর করুন: শয়তানকে পাত্তা দেবেন না। বেশি বেশি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ও 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম' পড়ুন।
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও শিফা দান করুন। আমীন।