পুরুষ ডাক্তারের অধিনে ডিউটি করা যাবে কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি ইন্টার্ণ ডাক্তার। আমাদের একটা নির্দিষ্ট জায়গা ভাগ করে দেওয়া হয় রোগী দেখার জন্য সাথে একজন মিড লেভেল ডাক্তার থাকেন।আমি আগে ইনার বারান্দায় ডিউটি করেছি ওখানে পুরুষ, মহিলা উভয় রোগী ছিলো। সবাইকে দেখা লাগতো। ওই জায়গাটুকুতে ৩ জন মহিলা ডাক্তার ছিলো যাদের আন্ডারে আমি কাজ করতাম।৩ জনের অর্ডার পালন করা আমার জন্য কষ্ট হয়ে যেতো ওনারা আমাকে প্রচুর খাটাতো।আর তাদের সাথে তেমন কিছু শিখতে পারতাম না।কারন তারা নিজেদের মতো রাউন্ড দিয়ে চলে যেতো। আমি আমার কাজ শেষ করতে করতে তাদের রাউন্ড শেষ হয়ে যেতো।এখন আমি জায়গা পরিবর্তন করতে চাচ্ছি।এখানে শুধু মহিলা রোগী কিন্তু ডাক্তার পুরুষ এবং হিন্দু যার আন্ডারে আমার কাজ করা লাগবে।শুনেছি ওনি ভালো শিখায়।উস্তাদ আমি আপনার পরামর্শ চাচ্ছি আমি কি ম্যামদের সাথেই কাজ করবো না কি এই স্যারের আন্ডারে কাজ করবো।ম্যামদের সাথে কাজ করলে পুরুষ, মহিলা সব রোগীর প্রেসার, পালস দেখা। অনেক সময় গায়ে হাত দিতে হয় যদিও হাত মোজা থাকে।সব বিবেচনা করে পরামর্শ দিলে মুনাসিব হতো
Answer
পুরুষ ডাক্তারের অধীনে ডিউটি করা যাবে কি না?
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম এই যে, আপনি ইন্টার্ন ডাক্তার। বর্তমানে তিনজন মহিলা ডাক্তারের অধীনে কাজ করছেন, যেখানে পুরুষ-মহিলা উভয় রোগী দেখতে হয় এবং প্রয়োজনে রোগীর শরীরে হাত দিতে হয় (মোজা থাকা সত্ত্বেও)। এখন আপনি এমন বিভাগে যেতে চান যেখানে রোগী শুধু মহিলা, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার পুরুষ এবং হিন্দু। জানতে চান—কোনটি আপনার জন্য শরীয়তসম্মত?
মূল নীতিমালা
১. পুরুষ-মহিলার اختلاط ও দেখা-স্পর্শের বিধান
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ
"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখুক এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করুক। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
"আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখুক এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করুক।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬, সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)
২. চিকিৎসার প্রয়োজনে স্পর্শের বিধান
ইসলামী শরীয়ত চিকিৎসার প্রয়োজনে ভিন্ন লিঙ্গের রোগীকে দেখা বা স্পর্শ করার ক্ষেত্রে শিথিলতা দিয়েছে, তবে শর্তসহ:
- প্রথম শর্ত: সমলিঙ্গের (same gender) ডাক্তার পাওয়া না যাওয়া।
- দ্বিতীয় শর্ত: প্রয়োজন পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকা (শুধু যতটুকু চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য)।
- তৃতীয় শর্ত: কামভাব বা ফিতনার আশঙ্কা না থাকা।
- চতুর্থ শর্ত: সম্ভব হলে মোজা/গ্লাভস বা কাপড়ের আড়াল রাখা।
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:
وَلَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى الْمَرْأَةِ الْأَجْنَبِيَّةِ إِلَّا لِلضَّرُورَةِ، وَالضَّرُورَةُ تُقَدَّرُ بِقَدْرِهَا
"পুরুষের জন্য অপরিচিতা নারীর দিকে তাকানো জায়েয নয়, তবে প্রয়োজনে—আর প্রয়োজন পরিমাণমতোই অনুমোদিত।"
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ
"প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭০)
তবে এই শিথিলতা শুধু রোগীর প্রতি প্রযোজ্য, সহকর্মী বা তত্ত্বাবধায়কের সাথে অবাধ মেলামেশার জন্য নয়।
আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ
বর্তমান অবস্থা (মহিলা ডাক্তারদের অধীনে):
- ✅ সুবিধা: তত্ত্বাবধায়ক মহিলা হওয়ায় পর্দার দিক থেকে তুলনামূলক ভালো।
- ❌ অসুবিধা: পুরুষ রোগীদের শরীরে হাত দেওয়া, তাদের প্রেসার-পালস দেখা—এটি পুরুষ রোগীর ক্ষেত্রে ফিতনার কারণ হতে পারে এবং শরীয়তের সীমা লঙ্ঘনের আশঙ্কা আছে।
- ❌ তিনজন মহিলা ডাক্তারের অধীনে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও শেখার সুযোগ কম—এটি দ্বীনি দিক থেকে ক্ষতিকর নয়, বরং পার্থিব অসুবিধা।
প্রস্তাবিত অবস্থা (পুরুষ হিন্দু ডাক্তারের অধীনে):
- ✅ সুবিধা: রোগী শুধু মহিলা—তাই পুরুষ রোগীর সাথে অবাধ মেলামেশার সমস্যা থাকবে না।
- ✅ ভালো শিক্ষার সুযোগ—দক্ষতা অর্জন দ্বীনি দায়িত্ব পালনের জন্য সহায়ক।
- ❌ অসুবিধা: তত্ত্বাবধায়ক পুরুষ ও হিন্দু—এর সাথে অবাধ মেলামেশা, একান্তে অবস্থান (খালওয়া) ইত্যাদি শরীয়তবিরোধী হতে পারে।
- ❌ মহিলা রোগীর শরীরে হাত দেওয়া—যদিও মোজা থাকে, তবুও সতর্কতা জরুরি।
ফিকহী সিদ্ধান্ত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ভিন্ন লিঙ্গের চিকিৎসা কেবল প্রয়োজনের সময় এবং সমলিঙ্গ ডাক্তার না থাকলে জায়েয। কিন্তু সহকর্মী বা তত্ত্বাবধায়কের সাথে অবাধ মেলামেশা, খালওয়া (একান্তে অবস্থান), বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়।
মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"চিকিৎসা পেশায় নারী-পুরুষের অবাধ اختلاط ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে অনুমতি আছে, শর্ত হলো ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩০)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা আন-নূরের তাফসীরে বলেন:
"দৃষ্টি সংযত রাখা কেবল দৃষ্টির নয়, বরং হৃদয়ের পবিত্রতারও রক্ষক। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করা ফিতনার দরজা খুলে দেয়।"
পরামর্শ
আপনার কর্তব্য হবে উভয় দিকের শরীয়তসম্মত ও অসুবিধাজনক দিকগুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া:
১. যদি সম্ভব হয়—এমন বিভাগ খুঁজুন যেখানে মহিলা রোগী + মহিলা তত্ত্বাবধায়ক উভয়ই আছে। এটি হবে সর্বোত্তম সমাধান।
২. যদি তা সম্ভব না হয়—তাহলে পুরুষ হিন্দু ডাক্তারের অধীনে যাওয়া শরীয়তের দিক থেকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ:
- রোগী শুধু মহিলা—পুরুষ রোগীর সাথে অবাধ মেলামেশার সমস্যা নেই।
- মহিলা রোগীর ক্ষেত্রে সমলিঙ্গ (মহিলা) হওয়ায় স্পর্শের বিধান শিথিল।
- তবে তত্ত্বাবধায়কের সাথে অবাধ মেলামেশা, খালওয়া, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।
- হিন্দু তত্ত্বাবধায়কের সাথে দ্বীনি বিষয়ে কোনো সম্পর্ক রাখবেন না, তবে পেশাগত কাজে সীমাবদ্ধ থাকবেন।
৩. মহিলা ডাক্তারদের অধীনে থাকা—যদি সেখানে পুরুষ রোগীদের শরীরে হাত দেওয়া লাগে, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পুরুষ রোগীর প্রতি মহিলা ডাক্তারের স্পর্শ ফিতনার কারণ হতে পারে।
৪. নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন—আপনার উদ্দেশ্য হোক রোগীর সেবা ও দ্বীনি দায়িত্ব পালন, পার্থিব সুবিধা নয়।
৫. ইস্তিখারা করুন—সিদ্ধান্তের আগে সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে হিদায়াত প্রার্থনা করুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | মহিলা ডাক্তারদের অধীনে | পুরুষ হিন্দু ডাক্তারের অধীনে | |------|------------------------|------------------------------| | রোগী | পুরুষ + মহিলা | শুধু মহিলা | | স্পর্শের প্রয়োজন | উভয় লিঙ্গে | শুধু মহিলা | | ফিতনার ঝুঁকি | বেশি (পুরুষ রোগী) | কম (শুধু মহিলা রোগী) | | তত্ত্বাবধায়ক | মহিলা (ভালো) | পুরুষ হিন্দু (সতর্কতা জরুরি) | | শেখার সুযোগ | কম | বেশি |
চূড়ান্ত পরামর্শ: যদি মহিলা রোগী + মহিলা তত্ত্বাবধায়কের ব্যবস্থা না থাকে, তবে পুরুষ হিন্দু ডাক্তারের অধীনে যাওয়া শরীয়তের দিক থেকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ, শর্ত হলো—তত্ত্বাবধায়কের সাথে অবাধ মেলামেশা, খালওয়া ও অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং মহিলা রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকা।
والله أعلم بالصواب