মুরগী জবাই নিয়ে প্রশ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
মুরগী জবাই সংক্রান্ত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—মুরগী বিক্রেতা জবাই করার সময় তিনি বাইরে থেকে বিসমিল্লাহ বলা স্পষ্ট শুনেননি, তবে নিজে বাইরে থেকে "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলেছেন। এছাড়া জবাইকারীর লুঙ্গি টাখনুর নিচে ছিল। এই অবস্থায় মুরগী জবাই শরীয়তসম্মত হয়েছে কি না?
প্রথম বিষয়: জবাইকারীর বিসমিল্লাহ বলা
ফিকহী মূলনীতি
হানাফী মাযহাবে জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত (ওয়াজিব নয়)। তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা মাকরূহ তাহরীমী হবে এবং গুনাহ হবে—যদিও পশু হালাল হবে। আর যদি ভুলে ছেড়ে যায়, তাহলে কোনো গুনাহ নেই এবং পশু হালাল হবে।
দলিল:
وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ — সূরা মায়িদা: ৩
فَكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ — সূরা আনআম: ১১৮
হাদীস:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৫৫
হানাফী কিতাবের বক্তব্য:
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
وَالْبَسْمَلَةُ سُنَّةٌ عِنْدَ الذَّبْحِ، لَا يَحِلُّ الْمَتْرُوكُ بِتَرْكِهَا، بَلْ يَحِلُّ وَيَأْثَمُ تَارِكُهَا عَمْدًا — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪৮৭ (দারুল মা'রিফা সংস্করণ)
অর্থাৎ, বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত; তা ছেড়ে দিলে পশু হালাল হওয়া বন্ধ হয় না, বরং হালাল হবে—তবে ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে।
ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:
ذَبْحِ کے وقت بسم اللہ پڑھنا سنت ہے، واجب نہیں۔ اگر جان بوجھ کر نہ پڑھے تو گناہ گار ہوگا، مگر جانور حلال ہوگا۔ — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৫
আপনার প্রশ্নে প্রয়োগ
যেহেতু আপনি জবাইকারীকে আগেই বলে দিয়েছেন যে বিসমিল্লাহ বলে জবাই করবেন, এবং তিনি সাধারণত তা বলেন—তাই ধরে নেওয়া হবে তিনি বিসমিল্লাহ বলেছেন। আপনি স্পষ্ট না শোনার কারণে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সন্দেহের কারণে হালাল বস্তু হারাম হয় না। ইসলামী মূলনীতি হলো:
الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ — মূল অবস্থা বহাল থাকে
অর্থাৎ, মূলত পশু হালাল; সন্দেহের কারণে হারাম হবে না।
তবে হ্যাঁ, যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে জবাইকারী বিসমিল্লাহ বলেনি (ইচ্ছাকৃতভাবে), তাহলে সেই মুরগী মাকরূহ তাহরীমী হওয়ার কারণে খাওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম ছিল। কিন্তু শুধু না শোনার কারণে সন্দেহ হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয় বিষয়: আপনি নিজে বাইরে থেকে বিসমিল্লাহ বলা
ফিকহী বিধান
জবাইয়ের সময় শুধু জবাইকারীর বিসমিল্লাহ বলা শর্ত। অন্য কারো বলা জবাইকারীর পক্ষ থেকে গণ্য হবে না। হানাফী মাযহাবে জবাইকারী নিজেই বিসমিল্লাহ বলবে—এটি সুন্নত।
দলিল:
فَكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ — সূরা আনআম: ১১৮
আয়াতে "যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে" বলা হয়েছে—অর্থাৎ জবাইকারীর নেওয়া নাম।
হানাফী কিতাব:
وَيُشْتَرَطُ أَنْ يَكُونَ الذَّابِحُ هُوَ الَّذِي يَذْكُرُ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى — আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৯
অর্থাৎ, জবাইকারী নিজেই আল্লাহর নাম নেবে—এটি শর্ত।
তবে, আপনার বাইরে থেকে বিসমিল্লাহ বলা নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি একটি ভালো কাজ। কিন্তু এটি জবাইকারীর বিসমিল্লাহর বিকল্প নয়। যদি জবাইকারী বিসমিল্লাহ না বলে, তাহলে আপনার বলা তাকে হালাল করবে না।
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:
لَوْ سَمَّى غَيْرُ الذَّابِحِ لَا يُعْتَبَرُ ذَلِكَ — ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৮৫
অর্থাৎ, জবাইকারী ছাড়া অন্য কারো বিসমিল্লাহ বলা গণ্য হবে না।
আপনার প্রশ্নে প্রয়োগ
আপনার বাইরে থেকে বিসমিল্লাহ বলা জবাইকারীর পক্ষ থেকে গণ্য হবে না। তবে যেহেতু আপনি তাকে আগেই বলে দিয়েছেন এবং তিনি সাধারণত বিসমিল্লাহ বলেন—তাই ইনশাআল্লাহ জবাই সহীহ হয়েছে।
তৃতীয় বিষয়: জবাইকারীর লুঙ্গি টাখনুর নিচে থাকা
ফিকহী বিধান
পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলানো হারাম বা মাকরূহ তাহরীমী। হাদীসে কঠোর সতর্কতা এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَهُوَ فِي النَّارِ — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৮৭
عَنْ أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ... وَالْمُسْبِلُ إِزَارَهُ — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬
হানাফী কিতাব:
وَيَحْرُمُ إِسْبَالُ الْإِزَارِ لِلرِّجَالِ إِذَا كَانَ تَحْتَ الْكَعْبَيْنِ — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬১
জবাইয়ের উপর এর প্রভাব
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলানো একটি আলাদা গুনাহ। এটি জবাইয়ের সহীহ হওয়ার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। জবাই সহীহ হওয়ার শর্তগুলো হলো:
- জবাইকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হওয়া
- জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া (বিসমিল্লাহ)
- জবাইয়ের যন্ত্র ধারালো হওয়া
- রক্ত প্রবাহিত হওয়া
- জবাইয়ের স্থানগুলো (শিরা, খাদ্যনালী, শ্বাসনালী) কাটা
টাখনুর নিচে কাপড় থাকা এই শর্তগুলোর কোনো একটিকেও ভঙ্গ করে না। তাই জবাই সহীহ হবে, তবে জবাইকারী আলাদা গুনাহের জন্য দায়ী থাকবে।
ফাতাওয়া উসমানী-তে আছে:
ٹخنے سے نیچے کپڑا لٹکانا حرام ہے، لیکن اس سے ذبح کی صحت پر کوئی اثر نہیں پڑتا۔ — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪০১
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | জবাইকারীর বিসমিল্লাহ বলা | সুন্নত; না বললে ইচ্ছাকৃত হলে গুনাহ, তবে পশু হালাল | | আপনি বাইরে থেকে বিসমিল্লাহ বলা | জবাইকারীর পক্ষ থেকে গণ্য হবে না, তবে নিজে সওয়াব পাবেন | | বিসমিল্লাহ না শোনার সন্দেহ | সন্দেহের কারণে হালাল বস্তু হারাম হয় না | | লুঙ্গি টাখনুর নিচে থাকা | জবাইকারীর জন্য আলাদা গুনাহ, তবে জবাই সহীহ | | মুরগী জবাই সহীহ হয়েছে কি? | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ সহীহ হয়েছে |
করণীয়
- মুরগী খাওয়া জায়েজ—সন্দেহের কারণে হারাম হবে না।
- জবাইকারীকে টাখনুর উপরে কাপড় রাখার জন্য নসীহত করুন—এটি তার দ্বীনী দায়িত্ব।
- ভবিষ্যতে জবাইয়ের সময় নিজে উপস্থিত থেকে বিসমিল্লাহ বলা শুনে নিন—এতে সন্দেহ দূর হবে।
- মনে রাখবেন, সন্দেহের কারণে হালাল বস্তু হারাম হয় না—এটি ইসলামের একটি বড় সুবিধা।
والله أعلم بالصواب