৫-৬ ভরি স্বর্নের গহনা থাকলে কি কুরবানি ওয়াজিব হবে? এবং দুজন মিলে কি একটি বকরি কুরবানি করা যাবে?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আমি একজন মহিলা। আমার কাছে প্রায় ১১ মাস হলো ৫-৬ ভরির মতন স্বর্নের গহনা আছে। আমার কি কুরবানি করা ওয়াজিব কিনা??
আর সেক্ষেত্রে আমার স্বামী এবং আমি একটি ছাগল কিনে দুইজনের পক্ষে কুরবানি দিলে কুরবানি আদায় হয়ে যাবে কিনা দুইজনের টাই?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমত, আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি:
(১) আপনার কাছে থাকা ৫-৬ ভরি (প্রায় ৫৮.৩২ থেকে ৬৯.৯৮ গ্রাম) সোনার গহনার কারণে আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব কি না?
(২) আপনার স্বামী ও আপনি মিলে একটি ছাগল কিনে উভয়ের পক্ষে কুরবানি দিলে তা আদায় হবে কি না?
নিচে হানাফি ফিকহের কিতাব ও ফাতাওয়ার ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করা হলো।
(১) কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত ও আপনার অবস্থা
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ হতে হবে:
- মুসলিম, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।
- মুসাফির (সফররত) না হওয়া।
- কুরবানির দিনগুলোতে (১০, ১১, ১২ জিলহজ) নিজের মৌলিক প্রয়োজন (বাসস্থান, খাবার, পোশাক ইত্যাদি) ও ঋণ পরিশোধের পর অতিরিক্ত সম্পদ হিসেবে সাড়ে সাত ভরি (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) রুপা বা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ/ব্যবসায়িক পণ্য বা সেই পরিমাণ প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র ও জায়গা জমি থাকা।
মহিলার গহনা কি এ নেসাবের মধ্যে গণ্য হবে?
হ্যাঁ, হানাফি ফিকহের প্রবল মতানুসারে, নেসাবের হিসাবে মহিলার পরিধানের উপযোগী সোনার গহনাও অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে যদি গহনা স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য হয় এবং তা নেসাবের চেয়ে কম হয়, তাহলে কুরবানি ওয়াজিব হবে না।
আপনার ক্ষেত্রে:
- ৫ ভরি সোনা = ৫ × ১১.৬৬৪ গ্রাম = ৫৮.৩২ গ্রাম।
- ৬ ভরি সোনা = ৬ × ১১.৬৬৪ গ্রাম = ৬৯.৯৮ গ্রাম।
- সম্মিলিত নেসাব= সবকিছু মিলিত হয়ে ৫২.৫ ভড়ি রূপার সমপরিমাণ হওয়া।
সুতরাং আপনার কাছে মোট সোনা নেসাবের চেয়ে কম। আর যেহেতু আপনি অন্য কোনো নেসাব সম্পত্তির (নগদ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য বা প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র ইত্যাদি) কথা উল্লেখ করেননি, তাই ধরে নেওয়া যায় যে আপনার মোট সম্পদ নেসাব পরিমাণ নয়। ফলে আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। তবে আপনি চাইলে নফল (সওয়াবের নিয়তে) কুরবানি দিতে পারেন।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৬২): "নেসাব কুরবানির ক্ষেত্রে জাকাতের নেসাবের সমান। তবে জাকাতের নেসাবে মহিলার গহনা ধর্তব্য নয়, কিন্তু কুরবানির নেসাবে তা ধর্তব্য।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/২৯২): "যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব। আর নেসাব হলো বিশ মিছকাল (সোনা) বা দুশো দিরহাম (রুপা) বা তার সমমূল্যের পণ্য।"
- বাহিশতী জেওর (কুরবানি অধ্যায়): "মহিলাদের গহনা যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তবে তা তাদের কুরবানি ওয়াজিব করার জন্য যথেষ্ট।"
(দ্রষ্টব্য: আপনার সোনার পরিমাণ নেসাবের কম, তাই কুুরবানি ওয়াজিব নয়।)
(২) স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি ছাগল দিয়ে কুরবানি দেওয়া
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, একটি ছাগল বা ভেড়া শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির পক্ষেই কুরবানি হিসেবে বৈধ। এটি দুই বা ততোধিক ব্যক্তির পক্ষে শরিকানা (ভাগাভাগি) করে দেওয়া জায়েজ নয়।
অপরদিকে, গরু, মহিষ বা উট সর্বোচ্চ সাত জন পর্যন্ত শরিকানা করে কুরবানি দিতে পারে।
সুতরাং আপনি এবং আপনার স্বামী যদি একটি ছাগল কিনে তার নিয়ত করেন যে "এই কুরবানি দুজনের পক্ষে", তবে তা কারো পক্ষেই আদায় হবে না। বরং আপনাদের প্রত্যেকের জন্য পৃথকভাবে একটি করে ছাগল বা একটি গরুতে ৭ ভাগের মধ্যে ২ ভাগ নিয়ে কুরবানি দিতে হবে।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৬৪): "الماعز لا تجزئ عن أكثر من واحد" (ছাগল একাধিক ব্যক্তির পক্ষে যথেষ্ট নয়)।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/২৯২): "ছাগল ও ভেড়া একাধিক ব্যক্তির পক্ষে জায়েজ নয়।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫৯): "একটি ছাগলের কুরবানি একাধিক ব্যক্তির পক্ষে জায়েজ নয়।"
সংক্ষিপ্ত উত্তর ও পরামর্শ
| বিষয় | ফয়সালা | |------|---------| | আপনার (মহিলা) ওপর কুরবানি ওয়াজিব? | না, কারণ আপনার সোনা নেসাবের (সাড়ে ৭ ভরি) চেয়ে কম। এবং এছাড়া আর কোনো সম্পদের কথা আপনি উল্লেখ করেননি | | স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি ছাগলে কুরবানি আদায় হবে? | না, একটি ছাগল শুধু একজনের পক্ষেই হয়। উভয়ের জন্য আলাদা ছাগল বা একটি গরুতে শরিকানা (সর্বোচ্চ ৭ জন) দরকার। |
পরামর্শ:
- আপনি চাইলে নফল কুরবানি দিতে পারেন।
- স্বামী-স্ত্রী চাইলে একটি গরু/মহিষ কিনে তাতে ৭ ভাগের মধ্যে ২ ভাগ (অর্থাৎ নিজেরা দুজন এবং আরও ৫ জন অন্য শরিক) নিয়ে কুরবানি দিতে পারেন। অথবা প্রত্যেকে আলাদা ছাগল কুরবানি করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কুরবানি আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে তথ্যসূত্র:
- কুরআন: সূরা আল-কাওসার (১০৮:২)
- হাদিস: সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৫৪৬
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৬২-২৬৪)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/২৯১-২৯৩)
- বাহিশতী জেওর (কুরবানি অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫৭-৪৬০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৩০-৪৩৫)