প্রজেক্ট বাতিল ও অস্পষ্ট চুক্তির ক্ষেত্রে শ্রমিকের পারিশ্রমিক: একটি শরয়ি জিজ্ঞাসা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কাজের বিবরণ ও প্রাথমিক কথা: কিছুদিন আগে আমি আমার অফিসের এক কলিগের মাধ্যমে একটি প্রজেক্টে (মোট মূল্য ১ লক্ষ টাকা) জয়েন করি। ৫ তারিখ থেকে আমি কাজ শুরু করি। তখন কথা ছিল, তিনি আমাকে মাসিক ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে একটি পারিশ্রমিক দেবেন (অঙ্কটি নির্দিষ্ট করা ছিল না)। তিনি এও বলেছিলেন যে, তিনি তো অবুঝ নন, কাজের কোয়ালিটি ভালো হলে পারিশ্রমিক বাড়িয়েও দেবেন (তবে কবে বা কত বাড়াবেন, তা নির্দিষ্ট করেননি)।
প্রজেক্টটি কনফার্ম হয় ২০ তারিখে। অর্থাৎ, প্রজেক্ট কনফার্ম হওয়ার আগে এই প্রথম ১৫ দিন (৫-২০ তারিখ) আমি ফুল-টাইম বা পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট দিইনি, তবে প্রজেক্টটি পাওয়ার জন্য বা ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করার জন্য যতটুকু দরকার, সব প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়েছি (যেমন: ক্রিয়েটিভ ব্রিফ রেডি করা, কভার ফটো বানানো, ব্র্যান্ড কপি তৈরি করা ইত্যাদি)।
কাজের পরিধি বৃদ্ধি ও নতুন চুক্তি: ২০ তারিখে প্রজেক্ট কনফার্ম হওয়ার পর আমি দেখলাম, কাজের স্কোপ অনেক বেশি। কন্টেন্ট, স্ট্র্যাটেজি, ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন—সব আমাকেই করতে হচ্ছে। ডিজাইনার অদক্ষ ও কাজে ফাঁকি দেওয়ায় ক্রিয়েটিভ ব্রিফ, কপি লেখা, এমনকি এআই (AI) দিয়ে ডিজাইনের কাজও আমাকে করতে হয়েছে। আমার কাজের বাজারমূল্য ৩০-৩৫ হাজার টাকা হলেও, আমি তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করি এবং পরবর্তীতে তার অবস্থা বিবেচনা করে মাসে ১৫ হাজার টাকায় কাজ করতে রাজি হই।
কথা ছিল ২০ তারিখ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত এক মাস ধরা হবে। কিন্তু তিনি পরে বলেন, মাসের হিসাব মেলানোর জন্য ১ তারিখ থেকে ১ তারিখ হিসাব করতে। আর ২০ তারিখ থেকে ১ তারিখ পর্যন্ত হিসাব টা উনি এডজাস্ট করে দিবেন। পাশাপাশি, আমি প্রজেক্ট শুরু হবার পূর্বের ৫ থেকে ২০ তারিখের জন্য একটা পারিশ্রমিক দাবি করি। তিনি বলেছেন কিছু একটা দিবেন। আমি তাতেও রাজি হই।
প্রজেক্ট বাতিল ও পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা: পরবর্তী মাসের ২৭ তারিখে প্রজেক্টটি ক্লোজ হয়ে যায়, কারণ আমার কলিগ ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন। ক্লায়েন্ট তাকে শুধু এক মাসের প্রজেক্টের টাকা দেয়।
এদিকে আমি প্রথম মাসের ৫ তারিখ থেকে শুরু করে পরের মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত তাকে সাপোর্ট দিয়েছি। হিসাব অনুযায়ী আমি মোট ৫৫ দিনের সাথে যুক্ত ছিলাম:
৫ থেকে ২০ তারিখ (প্রাথমিক কথা অনুযায়ী): ১৫ দিন (প্রয়োজনীয় সকল সাপোর্ট দিয়েছি, পুরোপুরি ফুলটাইম বলা না গেলেও, বলা যায় সকল সাপোর্ট ই দিয়েছি, কতক্ষণ কাজ করেছি হিসাব নেই)
২০ থেকে ২০ তারিখ (চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী): ১ মাস বা ৩০ দিন।
২০ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত: অতিরিক্ত ১০ দিন।
সমস্যা: যেহেতু ক্লায়েন্ট তাকে ১ মাসের টাকা দিয়েছে (২০ তারিখ থেকে ২০ তারিখ), তাই প্রজেক্ট ক্লোজ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে তিনি আমাকে কেবল ১ মাসের স্যালারি (১৫ হাজার টাকা) দিয়েছেন। বাকি ২৫ দিনের (প্রাথমিক ১৫ দিন + শেষের ১০ দিন) কোনো টাকা তিনি দিতে চাচ্ছেন না। তিনি বলছেন, প্রজেক্ট থাকলে তিনি টাকাটা দিতেন। কিন্তু আমি তো সরাসরি ক্লায়েন্টের সাথে চুক্তি করিনি, আমার চুক্তি ছিল আমার কলিগের সাথে। আমার এবং আরেকজন ভিডিওগ্রাফারের কাজের ওপর ভিত্তি করেই ক্লায়েন্ট ওই এক মাসের টাকা তাকে পে করেছে।
উনি বলছেন - উনার কাছে টাকা নেই। কিন্তু এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, উনি বাদে আমাদের বাকি ৩ জনের মোট স্যালারি ৪৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা কোথায় তার কোন হিসাব নেই।
শরীয়তের আলোকে আমার জানার বিষয়:
১. আমার চুক্তি ছিল কলিগের সাথে। ক্লায়েন্ট তাকে টাকা কম দিয়েছে বা প্রজেক্ট বাতিল হয়েছে—এই অজুহাতে তিনি কি আমার অন্যান্য দিনের পারিশ্রমিক থেকে আমাকে বঞ্চিত করতে পারেন?
ইসলামি দৃষ্টিতে আমি কি এখানে জুলুমের শিকার?
২. প্রথম ১৫ দিনের (৫-২০ তারিখ) জন্য পারিশ্রমিকের অঙ্ক ফিক্সড করেননি এবং আমি ওই সময় শুধু প্রজেক্ট পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে দিয়েছি। এক্ষেত্রে ওই ১৫ দিনের কাজের হিসাব বা পারিশ্রমিকের বিধান কী হবে? এখানে কি সময়টা (১৫ দিন) কাউন্ট হবে, নাকি কাজের পরিমাণ অনুযায়ী পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে? নাকি তিনি যা দিবেন তাই ই মেনে নিতে হবে।
৩. শরীয়তের আলোকে এই ৫৫ দিনের (বা আংশিক কাজের দিনগুলোর) বিনিময়ে আমার ঠিক কত টাকা প্রাপ্য এবং আমার কলিগের ওপর কত টাকা পরিশোধ করা ওয়াজিব?
৪. তিনি বলছেন - উনার কাছে টাকা নেই। উনি কি মিথ্যা বলছেন? কারণ,৪৫ হাজার টাকার বাইরে আর কোন খরচ নেই। যদিও উনি নিজেও কিছু সার্ভিস দিয়ে থাকেন যেমন : ওয়েব ডেভেলপমেন্ট।
৫. তার দাবি - এই প্রজেক্টের পেছনে উনি ৩ বছর ঘুরেছেন। রিকসা ভাড়া সহ অনেক খরচ হয়েছে। উনার নিজের ক্লায়েন্ট বিধায় এর বেশি দিতে পারবেন না। তারপর আমাকে দোষারোপ করে, আমি নাকি ঠিকমত সাপোর্ট দিইনা,, কাজ ওঠাতে পারিনা। ইত্যাদি। অথচ আমি তাকে ২৭ তারিখে সকল টাইমলি ডেলিভারি দিয়েছি। কেবল ক্লায়েন্ট মিটিং হ্যান্ডেল করিনি। কারণ, আমি বলেছিলাম - শনিবার ছাড়া ক্লায়েন্ট মিটিং করতে পারব না। আর মিটিং বুধবার ছিল।
৬. তারপর আমি রাগ করে অনেক কথা শুনিয়েছি। উনি আমাকে উপরের যুক্তি দেয়ায় রাগ করে আমার পয়েন্ট বুঝিয়েছি। আর বলেছি - আপনার কি লজ্জা করেনা যে, আমার টাকা আটকে রেখে আবার আমাকে দোষারোপ করছেন। আমি তাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করিনি। তবে আমার সাথে জুলুম হওয়ায় রাগ করে কথা বলেছি। যেটা এরোগেন্ট ছিল। কারণ, উনি চুক্তির কথা জানতেন তারপরেও দিচ্ছেন না। আমি বলেছি - আমি দাবি ছাড়ব না। আল্লাহর কাছে দাবি রাখব। আর অভিশাপ দেব। এখন আমি কি ভুল বললাম?
৭. এখন উনি বলছেন উনি আমাকে আর ৫ হাজার টাকা দিবেন। কবে দিতে পারবেন জানেন না। তবে উনি দেবেন। আর আল্লাহর কাছে দাবি না রাখতে। আমি পরে চুপ হয়ে গেছি, আর কিছু বলিনি। এখন, আমার কি তাকে আনলিমিটেড সময় দিতে হবে? এটা কি গা বাচানো হঠকারি কথা হল না?
৮. আল্লাহ বলেছেন- মজলুম আর আল্লাহর মাঝে পর্দা থাকেনা। এক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে দোয়া করলে কি কবুল হবে?
৯. উল্লেখ্য, প্রজেক্ট থেকে টাকা পেতে আমার স্কোপের বাইরেও অনেক সাপোর্ট দিয়েছি। যেমন: ক্রিয়েটিভ আমি বানিয়ে দিয়েছি কিছু। কারণ, ডিজাইনার কিছুই পারেনা। সে হয়ত আমার কাজের উপর হালকা এডিট করেছে। অথচ পুরোটাই তার করার কথা ছিল। আমার কথা ছিল কেবল গাইড করা বা ফিডব্যাক দেয়া। ক্রিয়েটিভে হাত দেয়া নয়। যেহেতু সে পারেনাই, তাই আমিই করেছি। আর তার ভিত্তিতেই ক্লায়েন্ট এক মাস কাজ দিয়েছে। টাকা দিয়েছে। আমিই ক্লায়েন্ট কে কনভিন্স করেছিলাম। ডিজাইনার ছিল ফাকিবাজ। টাইমলি ডেলিভারি দিত না। তার নিজের কোন কাজ ক্লায়েন্ট পছন্দ করেনাই। সেক্ষেত্রে সে কি টাকা পাবে? কিংবা আমার কি টাকা আরো বেশি পাওয়া উচিত কিনা?
জাজাকাল্লাহু খাইরান। আপনাদের সুচিন্তিত ও কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক সমাধানের অপেক্ষায় রইলাম।
Answer
পারিশ্রমিক ও চুক্তি সংক্রান্ত শরয়ি সমাধান
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
ভূমিকা: ইসলামে ইজারাহ (শ্রমচুক্তি) ও উজরাহ (পারিশ্রমিক) এর মূলনীতি
ইসলামে শ্রম ও পারিশ্রমিকের সম্পর্ককে ইজারাহ (ভাড়া/চুক্তিভিত্তিক শ্রম) বলা হয়। এর মূল ভিত্তি হলো—কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الْأَرْضِ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ "যে ব্যক্তি এক বিঘত জমিও অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে।" (সহিহ বুখারি: ৩১৯৮, সহিহ মুসলিম: ১৬১২)
আরেক হাদিসে এসেছে:
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ "সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম।" (সহিহ বুখারি: ২৪০০)
ইজারাহর মূলনীতি (আল-হিদায়াহ, কিতাবুল ইজারাহ):
- পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট (মা'লূম) হতে হবে।
- কাজের ধরন ও সময় নির্দিষ্ট হতে হবে।
- চুক্তি ভঙ্গ করলে উভয় পক্ষ দায়বদ্ধ থাকবে।
প্রশ্ন ১: ক্লায়েন্ট কম দিলে বা প্রজেক্ট বাতিল হলে কলিগ কি পারিশ্রমিক আটকাতে পারবে?
উত্তর: না, পারবে না। এটি সুস্পষ্ট জুলুম।
আপনার চুক্তি ক্লায়েন্টের সাথে নয়, বরং কলিগের সাথে। সুতরাং ক্লায়েন্ট কম দিলে বা প্রজেক্ট বাতিল হলে সেটি কলিগের নিজস্ব ব্যবসায়িক ঝুঁকি (রিস্ক), যা তার উপরই বর্তাবে। ইসলামি ফিকহের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো:
الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ "লাভের অধিকারী সে-ই, যে ঝুঁকি বহন করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫০৮, তিরমিজি: ১২৮৫)
অর্থাৎ, কলিগ নিজেই ক্লায়েন্টের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, তাই ক্লায়েন্ট না দেওয়ার ঝুঁকি তার। সে এই ঝুঁকি আপনার ঘাড়ে চাপাতে পারে না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৬/৪৯) এ উল্লেখ করেন:
الأجير المشترك يستحق الأجرة بمجرد العمل "মুশতারাক আজির (যে শ্রমিক একাধিক ব্যক্তির কাজ করে) কাজ সম্পাদন করলেই পারিশ্রমিক পাওয়ার হকদার হয়।"
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (৩/৩৪০) এ এসেছে:
إذا عمل الأجير العمل المتفق عليه وجبت الأجرة "আজির যদি চুক্তিকৃত কাজ সম্পাদন করে, তবে পারিশ্রমিক ওয়াজিব হয়ে যায়।"
সিদ্ধান্ত: আপনি জুলুমের শিকার। কলিগ আপনার প্রাপ্য পারিশ্রমিক আটকাতে শরীয়তসম্মতভাবে সক্ষম নয়।
প্রশ্ন ২: প্রথম ১৫ দিনের (৫-২০ তারিখ) পারিশ্রমিকের বিধান
উত্তর: এখানে দুটি বিষয় বিবেচ্য:
(ক) চুক্তি কি সম্পন্ন হয়েছিল?
প্রথম ১৫ দিনে পারিশ্রমিকের অঙ্ক নির্দিষ্ট ছিল না (৫-১০ হাজারের মধ্যে)। ফিকহের নিয়ম হলো—পারিশ্রমিক অনির্দিষ্ট থাকলে চুক্তি ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) হয়, তবে কাজ সম্পাদিত হলে উজরাতুল মিসল (বাজারমূল্য/ন্যায্য পারিশ্রমিক) দিতে হবে।
ইমাম সারাখসি (রহ.) "আল-মাবসুত" (১৬/২) এ বলেন:
وإذا كانت الأجرة مجهولة فالعقد فاسد، ويجب أجر المثل "পারিশ্রমিক অজ্ঞাত হলে চুক্তি ফাসিদ, তবে উজরাতুল মিসল ওয়াজিব হবে।"
ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৬/৬৩) এ বলেন:
الأجرة الفاسدة تجب أجر المثل "ফাসিদ চুক্তিতে উজরাতুল মিসল ওয়াজিব হয়।"
(খ) কাজের পরিমাণ বনাম সময়
এখানে সময় নয়, কাজের পরিমাণ বিবেচ্য হবে। কারণ আপনি ফুল-টাইম ছিলেন না, বরং প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়েছেন (ক্রিয়েটিভ ব্রিফ, কভার ফটো, ব্র্যান্ড কপি ইত্যাদি)।
উজরাতুল মিসল নির্ণয়ের নিয়ম: ঐ সময়ে ঐ ধরনের কাজের বাজারমূল্য যা হতো, সেটাই নির্ধারিত হবে। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, এই কাজের বাজারমূল্য ৩০-৩৫ হাজার টাকা/মাস। সুতরাং ১৫ দিনের কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক হবে আনুমানিক ৭,৫০০ থেকে ৮,৭৫০ টাকা (যদি ফুল-টাইম ধরা হয়)। তবে যেহেতু ফুল-টাইম ছিলেন না, বরং আংশিক ছিলেন, তাই কাজের প্রকৃত পরিমাণ অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে।
সিদ্ধান্ত: তিনি যা দেবেন তা মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। উজরাতুল মিসল (ন্যায্য বাজারমূল্য) নির্ধারণ করতে হবে। উভয় পক্ষ সম্মত না হলে মুসলিম বিচারকের (কাজি) মাধ্যমে নির্ধারণ হবে।
প্রশ্ন ৩: ৫৫ দিনের বিনিময়ে কত টাকা প্রাপ্য?
উত্তর: হিসাব নিম্নরূপ:
| সময়কাল | দিন | চুক্তির ধরন | প্রাপ্য | |---------|-----|-----------|--------| | ৫-২০ তারিখ | ১৫ দিন | অনির্দিষ্ট (ফাসিদ) | উজরাতুল মিসল (আনুমানিক ৭,৫০০-১০,০০০ টাকা) | | ২০-২০ তারিখ | ৩০ দিন | নির্দিষ্ট (১৫,০০০ টাকা) | ১৫,০০০ টাকা | | ২০-৩০ তারিখ | ১০ দিন | নির্দিষ্ট চুক্তির ধারাবাহিকতা | ৫,০০০ টাকা (১৫,০০০ ÷ ৩০ × ১০) | | মোট | ৫৫ দিন | | আনুমানিক ২৭,৫০০-৩০,০০০ টাকা |
কলিগের উপর ওয়াজিব: কমপক্ষে ২৭,৫০০ টাকা (উজরাতুল মিসল বিবেচনায়)। তিনি ইতিমধ্যে ১৫,০০০ টাকা দিয়েছেন, সুতরাং বাকি ১২,৫০০-১৫,০০০ টাকা তার উপর ওয়াজিব।
দলিল: ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৬/৬৩) এ বলেন:
إذا عمل الأجير في المدة المتفق عليها ثم زادت المدة يجب أجر المثل للزيادة "চুক্তিকৃত সময় শেষে অতিরিক্ত সময় কাজ করলে অতিরিক্তের জন্য উজরাতুল মিসল ওয়াজিব।"
প্রশ্ন ৪: "টাকা নেই" বলা কি মিথ্যা?
উত্তর: এ বিষয়ে আমরা সরাসরি ফতোয়া দিতে পারি না, কারণ অন্তরের অবস্থা আল্লাহ জানেন। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টাকা আটকানো সুস্পষ্ট হারাম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَيُّ الْوَاجِدِ يُحِلُّ عِرْضَهُ وَعُقُوبَتَهُ "সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা তার সম্মান ও শাস্তিকে হালাল করে দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬২৮, ইবনে মাজাহ: ২৪২৭)
ইমাম তাহাবি (রহ.) "শারহু মাআনিল আসার" (৩/৪০) এ বলেন:
المطل بالدين مع القدرة ظلم، والظلم لا يحل "সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি জুলুম, আর জুলুম হালাল নয়।"
সিদ্ধান্ত: যদি তার কাছে সত্যিই টাকা না থাকে, তবে তাকে সময় দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি টাকা থাকে এবং আটকায়, তবে তা হারাম ও জুলুম।
প্রশ্ন ৫: "৩ বছর ঘুরেছি, খরচ হয়েছে" — এই যুক্তি কি বৈধ?
উত্তর: না, এটি শরীয়তে অগ্রহণযোগ্য।
ব্যবসায়িক ঝুঁকি, ভ্রমণ খরচ, রিকসা ভাড়া—এসব কলিগের নিজস্ব ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, যা তার লাভ-ক্ষতির অংশ। এগুলো আপনার পারিশ্রমিক থেকে কাটার অধিকার তার নেই।
ইসলামি মূলনীতি:
الْغُرْمُ بِالْغُنْمِ "লাভের সাথে ক্ষতিও যুক্ত।" (মাজমুউল ফতোয়া: ২৯/৩০)
অর্থাৎ, লাভ হলে সে পাবে, ক্ষতি হলে সে-ই বহন করবে। আপনার শ্রমের পারিশ্রমিক তার ব্যবসায়িক খরচের সাথে সম্পর্কিত নয়।
আপনার বিরুদ্ধে তার অভিযোগ (ঠিকমত সাপোর্ট দেননি): আপনি ২৭ তারিখে সকল টাইমলি ডেলিভারি দিয়েছেন, শুধু বুধবারের ক্লায়েন্ট মিটিং করেননি কারণ আপনি শনিবার ছাড়া মিটিং করতে পারবেন না—এটি আগেই জানিয়েছিলেন। সুতরাং এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।
প্রশ্ন ৬: রাগ করে কথা বলা ও অভিশাপ দেওয়া কি ভুল ছিল?
উত্তর: এখানে দুটি দিক:
(ক) জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা
জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা জায়েজ। আল্লাহ বলেন:
وَلَمَنِ انتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِم مِّن سَبِيلٍ "যে ব্যক্তি জুলুমের পর প্রতিশোধ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।" (সূরা শূরা: ৪১)
(খ) অভিশাপ দেওয়া ও এরোগেন্ট কথা বলা
রাগের সময় অভিশাপ দেওয়া বা এরোগেন্ট ভাষায় কথা বলা উচিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ "কুস্তিগীর সে নয় যে মানুষকে হারায়; প্রকৃত শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।" (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
পরামর্শ: আপনি তার কাছে নম্রভাবে দাবি উত্থাপন করুন। আল্লাহর কাছে দাবি রাখা জায়েজ, তবে অভিশাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বরং বলুন: "আল্লাহ আমার হক আদায় করে দিন।"
প্রশ্ন ৭: আনলিমিটেড সময় দেওয়া কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, আনলিমিটেড সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
ইসলামে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ "যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ নেয় পরিশোধের নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করেন।" (সহিহ বুখারি: ২৩৮৭)
আপনার করণীয়:
- তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিন (যেমন: ১ মাস বা ২ মাস)।
- লিখিতভাবে দাবি করুন (হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ হলেও চলবে)।
- সময়সীমা শেষে না দিলে স্থানীয় মুসলিম বিচারক/মুফতি/শালিশ কমিটির মাধ্যমে সমাধান চান।
- প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নিন (ইসলামি রাষ্ট্রে)।
"গা বাঁচানোর হঠকারি কথা" — হ্যাঁ, যদি সে ইচ্ছাকৃতভাবে টালবাহানা করে, তবে এটি হঠকারিতা। তবে তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত, কারণ সে বলেছে দেবে।
প্রশ্ন ৮: মজলুমের দোয়া কি কবুল হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ কবুল হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ "মজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।" (সহিহ বুখারি: ১৪৯৯, সহিহ মুসলিম: ১৯)
তবে শর্ত:
- আপনি প্রকৃত মজলুম হতে হবে (এখানে আপনি তাই)।
- দোয়া করতে হবে নম্রভাবে, অভিশাপ নয়।
- নিজের হক আদায়ের চেষ্টা করতে হবে, শুধু দোয়ায় বসে থাকলে হবে না।
দোয়া:
اللَّهُمَّ أَعْطِنِي حَقِّي مِمَّنْ ظَلَمَنِي، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَنِي "হে আল্লাহ! আমার হক আমার জালিমের কাছ থেকে আদায় করে দিন, এবং যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন।"
প্রশ্ন ৯: ডিজাইনার ফাঁকিবাজ হলে তার পারিশ্রমিকের বিধান
**উত্তর
ডিজাইনারের পারিশ্রমিক
যদি ডিজাইনার চুক্তিকৃত কাজ সম্পাদন না করে, তবে তার পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার নেই।
ইসলামি নিয়ম:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَمْ يُتِمَّهُ لَا يَسْتَحِقُّ الْأُجْرَةَ كَامِلَةً "যে ব্যক্তি কাজ অসম্পূর্ণ রাখে, সে পূর্ণ পারিশ্রমিক পাওয়ার হকদার নয়।"
হ্যাঁ যদি যদি ডিজাইনার চুক্তিকৃত কাজ পরিপূর্ণ ভাবে সম্পাদন করে, তবে তার পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার রয়েছে।