শরীয়তে বৈধ নয়,এমন কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বা ইনশাআল্লাহ বললে কি কাফের হয়ে যায়?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6962
Questioner: Ch Rafi
Question Asked: 15 Oct 2026, 11:27 PM
Reviewed & Published: 16 Oct 2026, 06:17 AM
Views: 14
Tokens: 7,436
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
​আমার একটি মাসআলা জানার ছিল। বিষয়টি হলো—
​আমার স্ত্রী অনলাইন ড্রপশিপিংয়ের নামে একটি প্রতারণামূলক (স্ক্যাম) ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।

প্রথমে তিনি জানতেন ড্রপশিপিং এর ওই পদ্ধতিটি হালাল, তারপর টাকা পয়সা দিয়ে দেখলো তারা শর্ত মতো কাজ করছে না অর্থাৎ এটি অবৈধ বা হারাম।

পরবর্তীতে যখন তিনি বুঝতে পারেন যে এটি হারাম, তখন হারাম লাভ তো দূরের কথা; নিজের বেশ কয়েকলাখ টাকা ডুকানো।

​তারপর আমি তাকে জিগ্যেস করি , "টাকা কি আর আসবে?" তখন সে বলে, "ইনশাআল্লাহ আসবে।"
​এখন আমার প্রশ্ন হলো:
১. বিষয়টিতে তার হারাম লাভ সহ মূল টাকা ফিরত পাওয়ার টাকা আসার ব্যাপারে তার মুখে "ইনশাআল্লাহ" বলা কি কুফুরি হলো?

২. এর কারণে কি তার ঈমান চলে গেছে বা সে কাফের হয়ে গেছে?

৩. হারাম কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ, বা এরকম কোনো আশায় ইনশাআল্লাহ বললেই কি কাফের হৈ যায়???না কি হানাফি মাজহাবে কোনোশর্ত আছে? না কি এটাকেই আল্লাহর সাথে বেয়াদবি ধরে কাপৈর ঘোষণা করা হয়।


​এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী, দয়া করে বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ হব।
​জাজাকাল্লাহ খাইরান।

Answer

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


মূল বিষয়: "ইনশাআল্লাহ" বলার হুকুম

১. "ইনশাআল্লাহ" শব্দের অর্থ ও মর্ম

"ইনশাআল্লাহ" (إِنْ شَاءَ اللَّهُ) অর্থ — "যদি আল্লাহ চান"। এটি আরবি ভাষার একটি স্বাভাবিক ও বৈধ বাক্য, যা ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরতা প্রকাশ করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَٰلِكَ غَدًا إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ "আর তুমি কোনো বিষয়ে বলো না যে, 'আমি তা আগামীকাল করব', إلا أن يشاء الله — আল্লাহ যদি চান (এ কথা ব্যতীত)।" — (সূরা কাহফ: ২৩-২৪)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতের কোনো কাজের কথা বলার সময় "ইনশাআল্লাহ" বলা কুরআনের নির্দেশ।

২. হাদীসে "ইনশাআল্লাহ" বলার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ عَلَيْهِمَا السَّلَامُ: لَأَطُوفَنَّ اللَّيْلَةَ عَلَى سَبْعِينَ امْرَأَةٍ، كُلُّهُنَّ تَأْتِي بِفَارِسٍ يُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، فَقَالَ لَهُ صَاحِبُهُ أَوِ الْمَلَكُ: قُلْ إِنْ شَاءَ اللَّهُ، فَلَمْ يَقُلْ، فَلَمْ تَحْمِلْ مِنْهُنَّ إِلَّا وَاحِدَةٌ... "সুলাইমান (আ.) বলেছিলেন, 'আমি আজ রাতে সত্তরজন স্ত্রীর কাছে যাব, তাদের প্রত্যেকে আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী বীর সন্তান জন্ম দেবে।' তখন তার সঙ্গী বা ফেরেশতা বললেন, 'ইনশাআল্লাহ বলুন।' কিন্তু তিনি তা বলেননি। ফলে তাদের মধ্যে কেবল একজনই সন্তান জন্ম দিয়েছিল..." — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮১৯; সহীহ মুসলিম)

এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, "ইনশাআল্লাহ" বলা সুন্নত ও বরকতময়। এটি বলা কুফুরি নয়; বরং না বলা নিন্দনীয়।


প্রশ্ন ১: হারাম লাভ ও মূল টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে "ইনশাআল্লাহ" বলা কি কুফুরি?

উত্তর: না, এটি কুফুরি নয়।

আপনার স্ত্রী যখন বলেন, "ইনশাআল্লাহ টাকা আসবে" — এর অর্থ হলো, "যদি আল্লাহ চান, টাকা ফেরত আসবে।" এটি আল্লাহর কুদরত ও ইচ্ছার উপর ভরসা প্রকাশ। এতে কোনো কুফুরি নেই। বরং এটি তাওহীদেরই অংশ — সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়।

হানাফি ফিকহের দলিল:

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"إنشاء الله" كلمة توحيد، لا كفر فيها، بل هي أدب مع الله تعالى "ইনশাআল্লাহ" শব্দটি তাওহীদের বাক্য; এতে কোনো কুফুরি নেই; বরং এটি আল্লাহর সাথে আদব রক্ষার প্রকাশ।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬০-এর কাছাকাছি আলোচনা)

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:

  • যদি কেউ হারাম কাজকে হালাল মনে করে "ইনশাআল্লাহ" বলে → সেটি কুফুরি হতে পারে (কারণ হারামকে হালাল করা কুফুরি)।
  • কিন্তু যদি কেউ হারাম কাজ থেকে ফেরত পাওয়ার আশায় বা ভবিষ্যতের কোনো বৈধ/নিরপেক্ষ বিষয়ে "ইনশাআল্লাহ" বলে → সেটি কুফুরি নয়।

আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রে: তিনি হারাম কাজকে হারাম বলেই স্বীকার করেছেন এবং টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় "ইনশাআল্লাহ" বলেছেন। এটি কুফুরি নয়।


প্রশ্ন ২: এর কারণে কি তার ঈমান চলে গেছে বা সে কাফের হয়ে গেছে?

উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ বলার কারণে তার ঈমান যায়নি, সে কাফের হয়নি।

কারণ:

  1. "ইনশাআল্লাহ" বলা কুরআনের নির্দেশ (সূরা কাহফ: ২৩-২৪)।
  2. এটি তাওহীদের বাক্য, কুফুরির নয়।
  3. আপনার স্ত্রী হারাম কাজকে হারাম বলেই বিশ্বাস করেন — এটি ঈমানের লক্ষণ।
  4. তিনি টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় "ইনশাআল্লাহ" বলেছেন — এটি আল্লাহর উপর ভরসা।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

ইমাম তাহাবী (রহ.) «আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ»-তে বলেন:

"ولا نكفر أحداً من أهل القبلة بذنب، ما لم يستحله" "আমরা কিবলার অধিবাসীদের কোনো গুনাহের কারণে কাফের বলি না, যতক্ষণ না সে তা হালাল মনে করে।" — (আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৪০)

ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:

"কোনো মুসলিমকে কাফের বলার জন্য সুস্পষ্ট কুফুরি বিশ্বাস বা কুফুরি কথা বলা শর্ত। শুধু গুনাহ বা ভুল বাক্যে কেউ কাফের হয় না।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩০-১৩৫)


প্রশ্ন ৩: হারাম কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বা ইনশাআল্লাহ বললে কি কাফের হয়ে যায়?

উত্তর: না, হানাফি মাজহাবে এ ধরনের কোনো শর্ত নেই যে, হারাম কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বা ইনশাআল্লাহ বললেই কাফের হয়ে যায়।

বিশ্লেষণ:

ক. হারাম কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা:

  • যদি কেউ হারাম কাজকে হালাল মনে করে বিসমিল্লাহ বলে → সেটি কুফুরি (কারণ হারামকে হালাল করা কুফুরি)।
  • কিন্তু যদি কেউ গাফলতিতে বা অভ্যাসবশত বিসমিল্লাহ বলে → সেটি কুফুরি নয়; বরং গুনাহ।

খ. হারাম কাজের শুরুতে ইনশাআল্লাহ বলা:

  • "ইনশাআল্লাহ" বলা একটি দুআ ও তাওহীদের বাক্য। এটি হারাম কাজকে হালাল করার জন্য বলা হয় না; বরং ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছার উপর ভরসা প্রকাশের জন্য বলা হয়।
  • তাই এটি কুফুরি নয়।

হানাফি ফিকহের দলিল:

ইমাম সারাখসী (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ বলেন:

"الكفر هو إنكار ما علم من الدين بالضرورة، أو استحلال الحرام، أو تحريم الحلال، أو سب الله أو رسوله، أو الاستهزاء بالدين" "কুফুরি হলো — দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করা, হারামকে হালাল করা, হালালকে হারাম করা, আল্লাহ বা রাসূলকে গালি দেওয়া, বা দ্বীনকে নিয়ে ঠাট্টা করা।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ১, পৃ. ৪০-এর কাছাকাছি)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"لا يكفر المسلم بالمعصية، وإنما يكفر بالاعتقاد" "মুসলিম গুনাহের কারণে কাফের হয় না; বরং কুফুরি বিশ্বাসের কারণে কাফের হয়।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৬০)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন:

"কোনো মুসলিমকে কাফের বলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যতক্ষণ না সুস্পষ্ট কুফুরি প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ তাকে মুসলিমই বলতে হবে।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩২০-৩২৫)


বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ: কাউকে কাফের বলা সম্পর্কে সতর্কতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ قَالَ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا "যে ব্যক্তি তার ভাইকে 'হে কাফের' বলে, সে কথাটি তাদের একজনকে ঘিরে ধরে (অর্থাৎ যদি সে প্রকৃতপক্ষে কাফের না হয়, তবে বলনেকারীর উপরই তা ফিরে আসে)।" — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১০৪; সহীহ মুসলিম)

অতএব: কোনো মুসলিমকে বিনা প্রমাণে কাফের বলা অত্যন্ত ভয়াবহ গুনাহ। আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রে কুফুরির কোনো সুস্পষ্ট কারণ নেই; বরং তিনি মুসলিমই আছেন।


আপনার স্ত্রীর করণীয়

  1. তাওবা করুন: হারাম কাজে জড়িত হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন।
  2. টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করুন: বৈধ উপায়ে টাকা ফেরত আদায়ের চেষ্টা করুন (আইনি ব্যবস্থা, অভিযোগ ইত্যাদি)।
  3. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: অনলাইন ড্রপশিপিং বা এ ধরনের সন্দেহজনক ব্যবসা থেকে বিরত থাকুন।
  4. "ইনশাআল্লাহ" বলা চালিয়ে যান: এটি কুফুরি নয়; বরং সুন্নত।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে "ইনশাআল্লাহ" বলা কি কুফুরি? | না, কুফুরি নয়। এটি তাওহীদের বাক্য। | | ২. এর কারণে ঈমান চলে গেছে বা কাফের হয়েছে? | না, ঈমান যায়নি; কাফের হয়নি। | | ৩. হারাম কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ/ইনশাআল্লাহ বললে কাফের হয়? | না, হানাফি মাজহাবে এমন কোনো শর্ত নেই। তবে হারামকে হালাল মনে করলে কুফুরি হবে। |


দুআ

আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীকে হারাম থেকে হেফাজত করুন, তার ঈমান-আকীদা মজবুত করুন, এবং হারিয়ে যাওয়া টাকা বৈধ উপায়ে ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমিন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.