বাসে মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেলে ওযু ছাড়া ইশারায় নামাজ পড়া যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
এই ওযু না থাকা অবস্থায় বাসে কী ইশারায় নামাজ পড়ে নেয়া যাবে?
Answer
বাসে ইশারায় নামাজ পড়ার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী তাঁর স্ত্রীসহ বাসে বাসায় ফেরার পথে মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। বাস থেকে নামলে নামাজ পড়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ওযুও থাকে না। এমতাবস্থায় ওযু ছাড়া বাসে ইশারায় (সঙ্কেতে) নামাজ পড়া যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, ওযু ছাড়া ইশারায়ও নামাজ পড়া যাবে না। পবিত্রতা (তাহারাত) নামাজের জন্য অপরিহার্য শর্ত। ওযু বা তায়াম্মুম ছাড়া কোনো অবস্থাতেই নামাজ সহীহ হয় না — তা ফরজ হোক, সুন্নত হোক, বা ইশারায় আদায় হোক।
তবে হ্যাঁ, ওযু বা তায়াম্মুম থাকলে এবং বাস থেকে নেমে যমিনে নামাজ পড়ার প্রকৃত অসুবিধা থাকলে (যেমন: সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা, বা নামার সুযোগ না থাকা) — ফরজ নামাজ বাসে ইশারায় আদায় করা যাবে। এ ক্ষেত্রে কিবলামুখী হওয়া, দাঁড়ানো-রুকু-সিজদা যথাসম্ভব মেনে চলা ওয়াজিব।
পরবর্তীতে গন্তব্য স্থানে পৌঁছার পর উক্ত নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে।
পবিত্রতা নামাজের শর্ত — দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ...
"হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো..." (সূরা মায়িদা: ৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ أَحَدِكُمْ إِذَا أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ
"আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কারো নামাজ কবুল করেন না যখন সে অপবিত্র হয়, যতক্ষণ না সে ওযু করে।" (সহীহ বুখারী: ৬৯৫৪; সহীহ মুসলিম: ২২৫)
অন্য হাদিসে:
مِفْتَاحُ الصَّلَاةِ الطُّهُورُ
"নামাজের চাবি হলো পবিত্রতা।" (সুনানে তিরমিজি: ৩, সুনানে আবু দাউদ: ৬১)
হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত
রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
الطَّهَارَةُ شَرْطٌ لِصِحَّةِ الصَّلَاةِ لَا تَسْقُطُ بِحَالٍ مَعَ الْقُدْرَةِ
"পবিত্রতা নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত; সামর্থ্য থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই তা রহিত হয় না।" (রদ্দুল মুহতার: ১/২৭২)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
وَلَا تَجُوزُ الصَّلَاةُ بِدُونِ طَهَارَةٍ إِلَّا لِلْمَرِيضِ الْعَاجِزِ عَنِ الِاسْتِعْمَالِ فَيَتَيَمَّمُ
"পবিত্রতা ছাড়া নামাজ জায়েজ নয়; তবে যে রোগী পানি ব্যবহারে অক্ষম, সে তায়াম্মুম করবে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/২৫)
ইশারায় নামাজের বিধান
ইশারায় (সঙ্কেতে) নামাজ আদায়ের অনুমতি শুধু নফল নামাজে এবং অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরজ নামাজে ইশারা কেবল তখনই বৈধ যখন বাহনে (যানবাহনে) থাকা অবস্থায় নামাজ আদায় করতে হয় এবং যমিনে নামার সুযোগ না থাকে।
আল-হিদায়া-তে আছে:
وَيُصَلِّي الْمُسَافِرُ عَلَى الدَّابَّةِ الْفَرِيضَةَ إِذَا خَافَ فَوْتَ الْوَقْتِ أَوِ انْقِطَاعَ الرِّفْقَةِ، وَيُومِئُ إِيمَاءً وَيَجْعَلُ السُّجُودَ أَخْفَضَ مِنَ الرُّكُوعِ
"মুসাফির বাহনে ফরজ নামাজ পড়বে যদি সময় শেষ হওয়ার বা সাথী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে; সে ইশারায় আদায় করবে এবং সিজদাকে রুকুর চেয়ে নিচু করবে।" (আল-হিদায়া: ১/৮১)
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"বাহনে ফরজ নামাজ ইশারায় আদায়ের অনুমতি আছে, তবে শর্ত হলো — ওযু বা তায়াম্মুম থাকতে হবে, কিবলামুখী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, এবং তাকবিরে তাহরিমা দাঁড়িয়ে বা বসে যথাসম্ভব আদায় করতে হবে।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৪৭)
ওযু না থাকলে করণীয়
ওযু না থাকলে আপনার জন্য করণীয় হলো:
- বাস থেকে নামার সুযোগ থাকলে — নামুন, ওযু করুন বা তায়াম্মুম করুন, তারপর নামাজ পড়ুন।
- নামার সুযোগ না থাকলে — বাসে বসেই তায়াম্মুম করুন (যদি পবিত্র মাটি/দেয়াল/পাথরের মতো তায়াম্মুমের উপকরণ পাওয়া যায়), তারপর ইশারায় নামাজ আদায় করুন।
- তায়াম্মুমের উপকরণও না থাকলে — নামাজ কাজা হয়ে যাবে; পরে ওযু/তায়াম্মুম করে কাজা আদায় করবেন। ওযু ছাড়া নামাজ পড়া যাবে না।
তায়াম্মুমের দলিল:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا
"যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো।" (সূরা মায়িদা: ৬)