কাজ সহজ করা ও বারাকাহ বৃদ্ধির জন্য করণীয়
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কিন্তু রোজগারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে পড়াশুনায় বেশ অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছি।
এই মাসের 31 তারিখ থেকে পরীক্ষা শুরু, পড়া পুরাটাই বাকি। এমন কোনো দুয়া আছে কি যেটার মাধ্যমে পড়াশুনা সহজ হয়ে যায়? সময়ে বারাকাহ আসে?
আরো কিছু বিষয়ে কোনো সুন্নাহ দুয়া আছে কি?
১) রিজিকের বারাকাহ বৃদ্ধি
২) পড়াশুনা সহজকরণ
৩) সময়ের বারাকাহ বৃদ্ধি, যাতে কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারি
৪) সময়ের অপচয় যাতে না করি
৫) ঘুম যাতে কম আসে
প্রশ্নটা ঠিক গুছিয়ে করতে পারিনি, আফওয়ান।
Answer
পড়াশোনা সহজ, সময়ের বারাকাহ ও রিজিক বৃদ্ধির দুআ — সুন্নাহভিত্তিক পূর্ণ দিকনির্দেশনা
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
আপনার প্রশ্নটি অস্পষ্ট নয় — বরং অত্যন্ত বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যা চেয়েছেন তা মূলত পাঁচটি বিষয়: (১) রিজিকের বারাকাহ, (২) পড়াশোনা সহজকরণ, (৩) সময়ের বারাকাহ, (৪) সময়ের অপচয় রোধ, (৫) ঘুম কম আসা। ইসলামে এ সবের জন্য কুরআন-হাদিসে বহু দুআ ও আমল বর্ণিত আছে। নিচে ধারাবাহিকভাবে পেশ করছি।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য তার দিনের প্রথম ভাগে বারাকাহ দান করুন।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৬০৬; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১২১২; ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৩৬)
ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন। ফকিহগণ এ হাদিস থেকে প্রমাণ নিয়েছেন যে, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজ শুরু করলে বারাকাহ পাওয়া যায়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, ফজরের পর ঘুমকে উলামায়ে কেরাম মাকরূহ বলেছেন, কারণ তা রিজিক থেকে বঞ্চিত করে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৬৪ — কিতাবুস সালাত)
সুতরাং প্রথম আমল: ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে আর ঘুমাবেন না। এটিই বারাকাহর মূল চাবিকাঠি।
১) রিজিকের বারাকাহ বৃদ্ধির দুআ ও আমল
(ক) সুন্নাহ দুআ
রাসূলুল্লাহ ﷺ শেখাতেন:
«اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ»
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচান, এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে আপনি ছাড়া অন্যদের থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।" — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৬৩; মুসতাদরাকে হাকিম)
(খ) সকাল-সন্ধ্যার আমল
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا»
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিযকান তইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালা।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করি।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৯২৫; সহিহ ইবনে হিব্বান)
এটি ফজরের পর পড়া বিশেষ উপকারী।
(গ) সূরা ওয়াকিয়াহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ»
অর্থ: "যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ পড়বে, তাকে দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।" — (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস ২৪৯৮; ইবনে আসাকির)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ রিজিক বৃদ্ধির জন্য সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াতের কথা উল্লেখ করেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৬৮৩ — কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
(ঘ) ইস্তিগফার
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
«فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا»
অর্থ: "আমি বললাম, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য বাগান ও নদী-নালা তৈরি করবেন।" — (সূরা নূহ: ১০-১২)
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন: "চারটি বিষয়ের জন্য চারটি জিনিস — রিজিকের জন্য ইস্তিগফার..." (তাফসিরে ইবনে কাসির)
আমল: প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ)।
২) পড়াশোনা সহজকরণের দুআ
(ক) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দুআ
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا»
(উপরে উল্লেখিত)
(খ) মুসা (আ.)-এর দুআ — কুরআনে বর্ণিত
«رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي»
উচ্চারণ: রাব্বিশরাহলি সাদরি, ওয়া ইয়াসসিরলি আমরি, ওয়াহলুল উকদাতাম মিন লিসানি, ইয়াফকাহু কাওলি।
অর্থ: "হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করুন, আমার কাজ সহজ করুন, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করুন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।" — (সূরা ত্বহা: ২৫-২৮)
এটি পড়ার আগে পড়া অত্যন্ত মুজাররাব (পরীক্ষিত)।
(গ) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুআ যা তিনি আলী (রা.)-কে শিখিয়েছিলেন
«اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাকে হেদায়েত দিন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭২৫)
(ঘ) পড়ার আগে পড়ুন
«رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا»
অর্থ: "হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।" — (সূরা ত্বহা: ১১৪)
(ঙ) ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর আমল
ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলতেন: "আমি ইমাম মালিক (রহ.)-এর কাছে পড়তে গিয়ে আমার মুখস্থশক্তি বাড়ানোর জন্য এই দুআ পড়তাম।" তিনি পড়তেন:
«اللَّهُمَّ نَوِّرْ قَلْبِي، وَاشْرَحْ صَدْرِي، وَحَلِّلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমার হৃদয়কে আলোকিত করুন, আমার বক্ষ প্রশস্ত করুন, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করুন।"
৩) সময়ের বারাকাহ বৃদ্ধির দুআ ও আমল
(ক) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুআ
«اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي أَوْقَاتِنَا»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের সময়ে বারাকাহ দান করুন।"
(খ) ফজরের পরের সময়কে কাজে লাগান
উপরে উল্লিখিত হাদিস (আবু দাউদ ২৬০৬) অনুযায়ী — ভোরবেলা কাজ শুরু করলে বারাকাহ আসে। ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) «ফাতহুল বারী»-তে বলেছেন, এই হাদিস থেকে প্রমাণ হয় যে, দিনের প্রথমাংশে ঘুমানো বারাকাহ নষ্ট করে। (ফাতহুল বারী, খণ্ড ১১, পৃ. ১৪৮)
(গ) সময় নষ্ট না করার সুন্নাহ নীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ»
অর্থ: "দুটি নেয়ামত এমন, যাতে অনেক মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২)
আমল: প্রতিদিনের কাজের একটি তালিকা (রুটিন) তৈরি করুন। ইমাম ইবনে জাওযি (রহ.) «সাইদুল খাতির»-এ বলেছেন, সময়ের হিসাব না রাখলে তা নষ্ট হয়।
৪) সময়ের অপচয় রোধের আমল
(ক) দুআ
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْهَرَمِ، وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ»
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল জুবনি ওয়াল হারামি, ওয়াল বুখলি, ওয়া আউযুবিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, বার্ধক্য ও কৃপণতা থেকে; এবং জীবন-মরণের ফিতনা থেকে।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৬)
এটি প্রতিটি নামাজের পর পড়া সুন্নাহ।
(খ) সময় নষ্টের অন্যতম কারণ — সোশ্যাল মিডিয়া ও অপ্রয়োজনীয় কথা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ»
অর্থ: "মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের মধ্যে রয়েছে, অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করা।" — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৩১৭; ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৯৭৬)
৫) ঘুম কম আসার দুআ ও আমল
(ক) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুআ
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكَسَلِ وَالْهَرَمِ»
(উপরে উল্লিখিত — সহিহ বুখারি ৬৩৬৯)
(খ) ঘুমের আগে পড়ার সুন্নাহ দুআ
«بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا»
অর্থ: "হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মরি ও বাঁচি।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩২৪)
(গ) আয়াতুল কুরসি ও সূরা ইখলাস-ফালাক-নাস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পড়বে, তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসবে না।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩১১)
(ঘ) ঘুম কমাতে করণীয় (ফিকহি ও তিব্বি নির্দেশনা)
- রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমান — ইশার পর অপ্রয়োজনীয় জাগরণ মাকরূহ। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৮)
- দুপুরে কাইলুলাহ (কিছুক্ষণ বিশ্রাম) — এটি রাতের ইবাদতের জন্য শক্তি দেয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ কাইলুলাহকে সুন্নাহ বলেছেন। (খণ্ড ১, পৃ. ৩৬৪)
- বেশি খাওয়া পরিহার করুন — ইমাম গাজালি (রহ.) «ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন»-এ বলেছেন, বেশি খেলে ঘুম বাড়ে।
- ফজরের পর ঘুমাবেন না — এটি ঘুমের চক্র নষ্ট করে।
বিশেষ পরামর্শ — পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য
আপনার পরীক্ষা ৩১ তারিখ থেকে। এই অল্প সময়ে সর্বোচ্চ ফায়দা পেতে:
- প্রতিদিন ফজরের পর ২-৩ ঘণ্টা পড়ুন — এ সময়ে মস্তিষ্ক সবচেয়ে সক্রিয় থাকে এবং বারাকাহ থাকে।
- প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর উপরের দুআগুলো পড়ুন।
- সূরা ওয়াকিয়াহ প্রতি রাতে পড়ুন — রিজিক ও সময়ের বারাকাহর জন্য।
- ইস্তিগফার ১০০ বার প্রতিদিন।
- পড়ার আগে সূরা ত্বহা: ২৫-২৮ ও «রাব্বি যিদনি ইলমা» পড়ুন।
- সোশ্যাল মিডিয়া পরীক্ষার আগ পর্যন্ত বন্ধ রাখুন — এটি সময়ের সবচেয়ে বড় চোর।
- তাহাজ্জুদ — কমপক্ষে ২ রাকাত। রাতের শেষ প্রহরের দুআ কবুল হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮)