সপ্নে কুকুর দেখা সম্পর্কে ব্যাখ্যা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একটা সপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাই, কয়েক দিন আগে একটা সপ্ন দেখলাম, আমি কোথা থেকে যেন বাসায় ফিরছিলাম, রাস্তার দুই পাশে অনেক অনেক কুকুর দেখতে পাই, কুকুর গুলো কিছু বসে আছে, কিছু দাঁড়িয়ে আছে, কুকুর গুলো ভিন্ন ভিন্ন রঙের ছিল, কয়েকটা কুকুর আমার শরীরের সাথে ইচ্ছা করে হাল্কা ধাক্কা দেয় আর যায়, আমার এত কুকুর দেখে কিছু ভয় লাগতেছিল, আরেকটা একদম কালো কুকুর আমার পিছনে পিছনে আসতেই থাকে, বাসার সামনে কালো কুকুরটা একটু দাঁড়ায়, আমি দৌর দিয়ে বাসার মেইন গেইট লাগাই, কুকুরটাও দেখে হিংস্র ভাবে দৌড়ে আমার বাসায় আসতে চাইছিল, কিন্তু পারে নাই, সপ্নটা একদম বাস্তবিক লাগছিল, আমি সপ্নে প্রথমেই এত কুকুরগুলো দেখেই আতংকিত হয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে বাসার দিকে হাটা শুরু করছিলাম। এই সপ্নটার ব্যাখ্যা জানতে চাই।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী, প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা দরকার: স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবির) কোনো নিশ্চিত ইলম (জ্ঞানের) বিষয় নয়। এটি মূলত অনুমান ও সম্ভাবনার বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالرُّؤْيَا السَّوْءُ مِنَ الشَّيْطَانِ “সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর অশুভ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
অন্য হাদীসে এসেছে, স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, (৩) নিজের মনের কল্পনা। — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
তাই কোনো স্বপ্নকে চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষত কুকুর, সাপ, আগুন ইত্যাদি দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং নিয়মিত কুরআন-আযকার পড়া কর্তব্য।
স্বপ্নে কুকুর দেখা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
ফিকহ ও তাবিরের কিতাবগুলোতে স্বপ্নে কুকুর দেখার কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে:
১. কুকুর সাধারণত শত্রু, হিংসুক বা নিকৃষ্ট স্বভাবের মানুষের প্রতীক। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) ও অন্যান্য মুআব্বিরীন (স্বপ্ন-ব্যাখ্যাকারী) বলেন, কুকুর প্রায়ই এমন শত্রু বা হিংসুক ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে, যে প্রকাশ্যে শত্রুতা করে না, বরং গোপনে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। — তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সীরীন; মুনতাখাবুল কালাম ফি তাফসীরিল আহলাম
২. কালো কুকুর বিশেষভাবে শক্তিশালী শত্রু বা শয়তানের কুমন্ত্রণার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। তবে এটি কেবল সম্ভাবনা, নিশ্চিত কিছু নয়।
৩. কুকুরের ধাক্কা দেওয়া বা পিছু নেওয়া — এর অর্থ হতে পারে কোনো শত্রু বা হিংসুক আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু আল্লাহর হেফাজতে সে সফল হবে না। আপনার স্বপ্নে কুকুরটি বাসায় ঢুকতে পারেনি — এটি একটি সুসংকেত যে, শত্রুর ক্ষতি আপনার পর্যন্ত পৌঁছাবে না, ইনশাআল্লাহ।
৪. আল্লাহর নাম নিয়ে বাসার দিকে হাঁটা — এটি ইঙ্গিত করে যে আপনি বিপদের সময় আল্লাহর উপর ভরসা করেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” — সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩
করণীয়
১. আতঙ্কিত হবেন না। স্বপ্ন কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এটি শয়তানের ভয় দেখানোর একটি মাধ্যমও হতে পারে।
২. নিয়মিত আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস ও সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসী পড়বে, সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক তার সাথে থাকবে এবং শয়তান তার কাছে আসবে না। — সহীহ বুখারী, হাদীস ২৩১১
৩. ঘুমানোর আগে অযু করে ডান কাত হয়ে শোয়া, এবং নিম্নোক্ত দুআ পড়া:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ “আমি আল্লাহর পূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৮
৪. খারাপ স্বপ্ন দেখলে: বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (শুকনোভাবে), শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া, এবং যে কাত হয়ে শুয়ে ছিল তা পরিবর্তন করা। — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২
৫. কারও কাছে খারাপ স্বপ্ন বর্ণনা না করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অপছন্দনীয় স্বপ্ন কারও কাছে বর্ণনা করবে না; কারণ তাতে ক্ষতি হতে পারে। — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
৬. নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আযকার, দরুদ শরীফ, ইস্তিগফার ও সদকা চালু রাখুন। সদকা বিপদ দূর করে। — সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪১০-এর আলোচনা; ফাতহুল বারী
৭. যদি কোনো নির্দিষ্ট শত্রু বা হিংসুকের আশঙ্কা থাকে, তবে তার সাথে সতর্ক থাকুন, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগ করবেন না। আল্লাহর কাছে হেফাজতের দুআ করুন।
সংক্ষেপে
আপনার স্বপ্নটি সম্ভবত কোনো শত্রু বা হিংসুকের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করে, তবে আল্লাহর রহমতে তার ক্ষতি আপনার পর্যন্ত পৌঁছাবে না। এটি ভয় পাওয়ার বিষয় নয়; বরং আল্লাহর উপর ভরসা বাড়ানোর ও আযকার-ইবাদতে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যা চূড়ান্ত সত্য নয়, তাই এটি নিয়ে অস্থির না হয়ে আল্লাহর হেফাজত কামনা করুন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমীন।