পূর্ববর্তী উম্মতগণ কীভাবে সালাত আদায় করতেন?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
আদম আ. থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগ পর্যন্ত পূর্ববর্তী উম্মতগণ কীভাবে সালাত আদায় করতেন?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—আদম আ. থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগ তথা কুরআন নাযিলের পূর্ব পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল ও তাদের উম্মতগণ কীভাবে সালাত আদায় করতেন? কারণ কুরআনের মাধ্যমেই তো আল্লাহ তায়ালা আমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন।
উত্তর
মূলনীতি: ওহি কেবল কুরআন নয়
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—আল্লাহ তায়ালার পথপ্রদর্শন কেবল কুরআনের মাধ্যমেই হয়নি; বরং ওহির মাধ্যমেই হয়েছে। ওহির দুই প্রকার:
- ওহি মাতলু (وحي متلو) — যা তিলাওয়াত করা হয়, অর্থাৎ কুরআন।
- ওহি গায়রে মাতলু (وحي غير متلو) — যা তিলাওয়াত করা হয় না, অর্থাৎ সুন্নাহ/হাদীস।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ "তিনি মনগড়া কথা বলেন না; এতো কেবল ওহি, যা তার প্রতি নাযিল করা হয়।" — (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)
আরও ইরশাদ করেন:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا "রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" — (সূরা আল-হাশর: ৭)
সুতরাং প্রত্যেক নবীর যুগে আল্লাহ তায়ালা হয় কিতাব নাযিল করেছেন, নয়তো ওহির মাধ্যমে বিধান দিয়েছেন। ইবরাহীম আ.-এর কাছে সহীফা ছিল, মূসা আ.-এর কাছে তাওরাত, দাউদ আ.-এর কাছে যাবূর, ঈসা আ.-এর কাছে ইঞ্জিল। আর যাদের কাছে কিতাব ছিল না, তাদের কাছে ওহি ও নবীর সুন্নাহ-ই ছিল পথপ্রদর্শনের মাধ্যম।
পূর্ববর্তী উম্মতদের সালাতের পদ্ধতি
১. আদম আ.-এর যুগ
হযরত আদম আ. ছিলেন প্রথম নবী ও প্রথম মানুষ। তাঁকে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি শিক্ষা দিয়েছিলেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ عَلَّمَ آدَمَ ... "নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে শিক্ষা দিয়েছেন..."
আদম আ.-এর সালাতের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে বিস্তারিত বিবরণ নেই। তবে এটা নিশ্চিত যে, তিনি আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তাঁর সন্তানদের ইবাদতের শিক্ষা দিতেন। ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) ও ইমাম কুরতুবী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, আদম আ. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর হামদ-সানা ও তাসবীহ পাঠ করতেন।
২. নূহ আ., ইবরাহীম আ., ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর যুগ
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ... وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ "আমরা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক ও ইয়াকূবের প্রতি ওহি করেছি... এবং সালাত কায়েম করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৬৩-এর প্রেক্ষিতে; আরও দেখুন সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৩)
ইবরাহীম আ. সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا "নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন এক উম্মত, আল্লাহর প্রতি অনুগত, একনিষ্ঠ।" — (সূরা আন-নাহল: ১২০)
ইসমাঈল আ. সম্পর্কে:
وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِندَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا "তিনি তাঁর পরিবারকে সালাত ও যাকাতের আদেশ দিতেন এবং তিনি তাঁর রবের কাছে প্রিয় ছিলেন।" — (সূরা মারইয়াম: ৫৫)
মূল কথা: তাঁদের সালাতের বিধান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে দিয়েছিলেন—হয় সরাসরি, নয়তো পূর্ববর্তী কিতাবের মাধ্যমে। তাঁদের সালাতের রুকন, ওয়াক্ত ও পদ্ধতি হয়তো আমাদের থেকে ভিন্ন ছিল, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল এক—আল্লাহর ইবাদত।
৩. মূসা আ. ও বনী ইসরাঈলের যুগ
তাওরাত নাযিলের পর বনী ইসরাঈল তাওরাতের বিধান অনুযায়ী সালাত আদায় করত। কুরআনে ইরশাদ:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ "সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ করো।" — (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)
তাওরাতে বনী ইসরাঈলের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে সালাতের বিধান ছিল। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের সালাতের ওয়াক্ত ও সংখ্যা আমাদের থেকে ভিন্ন ছিল। যেমন—তাওরাতে প্রতিদিন দুই ওয়াক্ত সালাতের উল্লেখ পাওয়া যায়।
৪. ঈসা আ. ও ইঞ্জিলের যুগ
ঈসা আ. ইঞ্জিলের বিধান অনুযায়ী সালাত আদায় করতেন। কুরআনে ঈসা আ.-এর ভাষায় ইরশাদ:
وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا "আর তিনি আমাকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি।" — (সূরা মারইয়াম: ৩১)
কেন আমাদের সালাতের পদ্ধতি ভিন্ন?
প্রত্যেক নবীর শরীয়ত ছিল স্বতন্ত্র, তবে মূল আকীদা (তাওহীদ) ছিল এক। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا "তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমরা একটি শরীয়ত ও পথ নির্ধারণ করেছি।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৪৮)
আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
نَحْنُ مَعَاشِرَ الْأَنْبِيَاءِ ... "আমরা নবীগণ..."
আরও এসেছে:
إِنَّا مَعَاشِرَ الْأَنْبِيَاءِ أُمِرْنَا ...
সুতরাং পূর্ববর্তী উম্মতদের সালাতের পদ্ধতি তাদের শরীয়ত অনুযায়ী ছিল, আর আমাদের পদ্ধতি আমাদের শরীয়ত (কুরআন ও সুন্নাহ) অনুযায়ী। সালাতের মূল রূপ আল্লাহ তায়ালা জিবরীল আ.-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সরাসরি শিক্ষা দিয়েছেন মি'রাজের রাতে—এটি আমাদের জন্য বিশেষ সম্মান।
হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত হলো—সালাতের মূল বিধান পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যেও ছিল, তবে আমাদের সালাতের পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ।
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন:
"সালাত是所有 ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যেও ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য এর পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।"
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে বলেন:
"পূর্ববর্তী নবীদের সালাতের বিধান তাদের কিতাব ও ওহির মাধ্যমে ছিল। আমাদের জন্য কুরআন ও সুন্নাহ-ই চূড়ান্ত দলীল।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিবরণ | |------|--------| | পথপ্রদর্শনের মাধ্যম | কেবল কুরআন নয়; বরং ওহি (কিতাব + সুন্নাহ) | | আদম আ. | সরাসরি আল্লাহর শিক্ষা ও ইবাদত | | ইবরাহীম আ. | ওহি ও সহীফা অনুযায়ী সালাত | | মূসা আ. | তাওরাতের বিধান অনুযায়ী | | ঈসা আ. | ইঞ্জিলের বিধান অনুযায়ী | | আমাদের সালাত | কুরআন ও সুন্নাহ; মি'রাজের রাতে সরাসরি শিক্ষা |
উপসংহার: পূর্ববর্তী উম্মতগণ তাদের নিজ নিজ কিতাব ও ওহির মাধ্যমে সালাত আদায় করতেন। কুরআন আমাদের জন্য চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক, তবে কুরআনের আগেও আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে পথপ্রদর্শন করেছেন। আমাদের সালাতের পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত, যা কুরআনের বিধান ও হাদীসের বিস্তারিত বিবরণের সমন্বয়ে গঠিত।