ইশরাক, সালাতুত দোহা, চাশত ও আওয়াবিনের সালাত কি একই?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
সুর্যদয় এর পর ২ রাকাত সালাত পড়লে কি ইশরাক ও চাশতের সালাতের ফজিলত দুটোই পাবো নাকি চাশতের জন্য দেরি করে মানে ৯/১০টার সময় পড়তে হবে?
Answer
ইশরাক, সালাতুত দোহা, চাশত ও আওয়াবিনের সালাত: বিস্তারিত বিশ্লেষণ
ভূমিকা
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথমত, ইশরাক, সালাতুত দোহা, চাশত ও আওয়াবিনের সালাত একই কি না; দ্বিতীয়ত, সূর্যোদয়ের পর দুই রাকাত পড়লে ইশরাক ও চাশতের ফজিলত উভয়ই পাওয়া যাবে কি না, নাকি চাশতের জন্য ৯/১০টার সময় পর্যন্ত দেরি করতে হবে।
প্রথম অংশ: ইশরাক, সালাতুত দোহা, চাশত ও আওয়াবিনের সালাতের পরিচয় ও পার্থক্য
১. ইশরাকের সালাত (صلاة الإشراق)
ইশরাক শব্দের অর্থ হলো সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়া। ফিকহের পরিভাষায় সূর্যোদয়ের পর প্রায় ১৫-২০ মিনিট পরে (মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর) যে নফল সালাত আদায় করা হয়, তাকে সালাতুল ইশরাক বলা হয়।
হাদিসে এসেছে, হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতে আদায় করে, অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকে, অতঃপর দুই রাকাত সালাত আদায় করে, সে একটি পূর্ণ হজ ও উমরার সওয়াব পাবে।"
— (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬)
ইমাম তিরমিজি (রহঃ) এই হাদিসকে হাসান বলেছেন।
২. সালাতুত দোহা (صلاة الضحى) বা চাশতের সালাত
দোহা বা চাশত শব্দের অর্থ হলো পূর্বাহ্ন বা সকাল। ফিকহের পরিভাষায় সূর্যোদয়ের পর থেকে দ্বিপ্রহর (যাওয়াল) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আদায়কৃত নফল সালাতকে সালাতুত দোহা বা চাশতের সালাত বলা হয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি চাশতের সময় দুই রাকাত সালাত আদায় করে, তার গুনাহ ক্ষমা করা হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়।"
— (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪৭৬)
৩. আওয়াবিনের সালাত (صلاة الأوابين)
আওয়াবিন শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। ফিকহের পরিভাষায় মাগরিবের ফরজ ও সুন্নতের পর যে নফল সালাত আদায় করা হয়, তাকে সালাতুল আওয়াবিন বলা হয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি মাগরিবের পর দুই রাকাত (নফল) আদায় করে, সে আওয়াবিনের সালাত আদায় করল।"
— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১১৬৭)
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) তাঁর "ইসলামী মাসায়েল" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আওয়াবিনের সালাত মাগরিবের সুন্নতের পর থেকে ইশার আগ পর্যন্ত আদায় করা যায়, তবে মাগরিবের পরপরই আদায় করা উত্তম।
৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বিষয় | ইশরাক | চাশত/দোহা | আওয়াবিন | |------|--------|------------|----------| | সময় | সূর্যোদয়ের পর ১৫-২০ মিনিট পরে | সূর্যোদয় থেকে যাওয়াল পর্যন্ত | মাগরিবের পর | | রাকাত | ২ রাকাত (সর্বনিম্ন) | ২ থেকে ১২ রাকাত | ২ থেকে ২০ রাকাত | | ফজিলত | হজ ও উমরার সওয়াব | গুনাহ মাফ | নেক সওয়াব | | সম্পর্ক | চাশতেরই একটি বিশেষ সময় | ইশরাক এর চেয়ে ব্যাপক | সম্পূর্ণ ভিন্ন |
সিদ্ধান্ত: ইশরাক ও চাশত মূলত একই সালাত, তবে সময়ের দিক থেকে ইশরাক হলো চাশতের একটি বিশেষ অংশ (সূর্যোদয়ের পরপর)। আর আওয়াবিন সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের সালাত। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইশরাক ও দোহা একই সালাত, তবে ইশরাকের সময় নির্দিষ্ট।
দ্বিতীয় অংশ: সূর্যোদয়ের পর ২ রাকাত পড়লে কি উভয় ফজিলত পাওয়া যাবে?
ফুকাহায়ে কেরামের মতামত
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) "রাদ্দুল মুহতার" (২/২৪) গ্রন্থে লিখেছেন:
"ইশরাকের সালাত হলো সূর্যোদয়ের পর যখন সূর্য এক বর্শা পরিমাণ উঁচু হয়, তখন আদায়কৃত দুই রাকাত। আর দোহা বা চাশতের সালাত হলো যখন সূর্য ভালোভাবে উঁচু হয় (অর্থাৎ দিনের প্রথম ভাগে)।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) "মাআরিফুল কুরআন" গ্রন্থে সূরা শামসের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, চাশতের সালাতের সর্বোত্তম সময় হলো যখন সূর্য ভালোভাবে উঁচু হয়ে যায় এবং গরম বেড়ে যায়।
আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) "বাহিশতী জেওর" গ্রন্থে লিখেছেন:
"চাশতের সালাতের সময় সূর্যোদয়ের পর থেকে যাওয়াল পর্যন্ত। তবে উত্তম সময় হলো দিনের প্রথম ভাগে যখন সূর্য ভালোভাবে উঁচু হয়।"
হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"আমার প্রিয় বন্ধু (রাসূলুল্লাহ সাঃ) আমাকে তিনটি বিষয়ের অসিয়ত করেছেন: প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দুই রাকাত চাশতের সালাত আদায় করা, এবং ঘুমানোর আগে বিতরের সালাত আদায় করা।"
— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৭৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২১)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, চাশতের সালাত একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যা সূর্যোদয়ের পর থেকে যাওয়াল পর্যন্ত যেকোনো সময় আদায় করা যায়।
ফজিলতের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত
প্রশ্ন: সূর্যোদয়ের পর ২ রাকাত পড়লে কি ইশরাক ও চাশতের ফজিলত দুটোই পাবো?
উত্তর: হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ উভয় ফজিলতই পাওয়া যাবে। কারণ:
১. ইশরাকের সালাত মূলত চাশতের সালাতেরই একটি বিশেষ সময়ে আদায়কৃত রূপ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) স্পষ্ট করেছেন যে, ইশরাক ও দোহা একই সালাত।
২. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহঃ) "ফয়জুল বারী" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইশরাকের সালাত চাশতের সালাতের অন্তর্ভুক্ত, তবে সময়ের দিক থেকে বিশেষ।
৩. মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) "ফাতাওয়া উসমানি" (১/৪০২) গ্রন্থে লিখেছেন:
"সূর্যোদয়ের পর ইশরাকের সময় দুই রাকাত আদায় করলে ইশরাকের ফজিলত তো পাওয়া যাবেই, বরং চাশতের সালাতের ফজিলতও পাওয়া যাবে, কারণ এটি চাশতেরই একটি সময়।"
তবে কি ৯/১০টার সময় পড়তে হবে?
উত্তর: না, বাধ্যতামূলকভাবে ৯/১০টার সময় পড়তে হবে না। তবে উত্তম হলো সূর্য ভালোভাবে উঁচু হওয়ার পর (অর্থাৎ দিনের প্রথম ভাগে, প্রায় ৯-১০টার দিকে) আদায় করা। কারণ:
১. হাদিসে উত্তম সময়: হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"চাশতের সালাত তখন আদায় করো যখন সূর্য ভালোভাবে উঁচু হয়ে যায়।"
— (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪৭৮)
২. ইমাম তাহতাবি (রহঃ) "শরহে মাআনিল আসার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, চাশতের সালাতের উত্তম সময় হলো যখন সূর্য এক-চতুর্থাংশ আকাশে উঠে যায়।
৩. ফাতাওয়া আলমগিরি (১/১১২) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"চাশতের সালাতের সময় সূর্যোদয় থেকে যাওয়াল পর্যন্ত। তবে উত্তম হলো যখন সূর্য ভালোভাবে উঁচু হয়।"