হাদিসের মান নির্ধারণ।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6785
Questioner: GOLAM OHIB
Question Asked: 12 Oct 2026, 11:41 AM
Reviewed & Published: 12 Oct 2026, 12:37 PM
Views: 12
Tokens: 6,092
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ ।

উক্ত হাদিস গুলা কি সহিহ?
হাসান (র) হতে বর্ণিতঃ

সম্ভব হলে তুমি তোমার পরিবারের কারো চুলের দিকে দৃষ্টিপাত করবে
না। তবে তোমার স্ত্রী বা ছোট্ট বালিকা হলে ভিন্ন কথা।

আল-আদাবুল মুফরাদ: ৩৬৭
Source: https://ihadis.com/adabul-mufrad/hadith/367.
২. যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের দিকে ডাকলো সে তার বাবার লজ্জাস্থান কামড় দিয়ে আকড়ে ধরলো।

৩। খোরাসানের পুর্ব্দিকে একটা বাহিনী কালো পতাকা নিয়ে বের হবে, তোমরা বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাদের সাথে মিলিত হবে?

৪. হাদিসের রাবী গন এর জীবন সবাই সমান বা একই জীবনি পড়েন তাহিলে হাদিসস্রর মানে মত ভিন্নতা আসে কেন?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো কয়েকটি আলাদা আলাদা মাসআলা। নিচে ধারাবাহিকভাবে হানাফি ফিকহ ও মুহাদ্দিসীনদের মানহাজ অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হলো।


১. আল-আদাবুল মুফরাদ: ৩৬৭ নম্বর হাদিসের সনদ ও মান

হাদিসটি হলো:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ الْخَطَّابِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ، قَالَ: حَدَّثَنِي رَزِينُ بْنُ عَبْدِ اللهِ، عَنْ حَبِيبِ بْنِ أَبِي ثَابِتٍ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ ضَمْرَةَ، عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «لَا تَتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ»

অর্থ: হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় দৃষ্টি দিও না; কারণ প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য (ক্ষমাযোগ্য), আর দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার জন্য নয়।”

সনদ পর্যালোচনা:

  • ইমাম বুখারী (রহ.) এই হাদিসটি ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’-এ (৩৬৭) বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম তিরমিযী (রহ.) ‘সুনান’ (২৭৭৭)-এ বর্ণনা করে বলেছেন: حَسَنٌ غَرِيبٌ — “হাসান গরীব”।
  • ইমাম আবু দাউদ (রহ.) ‘সুনান’ (২১৪৯)-এ বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম হাকিম (রহ.) ‘আল-মুস্তাদরাক’ (২/৩৯৩)-এ বর্ণনা করে সহিহ বলেছেন, তবে ইমাম যাহাবী (রহ.) তার ‘তালখীস’-এ সনদ নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
  • শায়খ আলবানী (রহ.) ‘সিলসিলা সহিহা’ (৫/৩২৩) ও ‘সহিহ আল-জামি’ (৭৯৫৩)-এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

সিদ্ধান্ত: হাদিসটি হাসান-সহিহ পর্যায়ের। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় — আপনি যে অনুবাদ উল্লেখ করেছেন, সেটি হাদিসের মূল ইবারতের অনুবাদ নয়। মূল হাদিসে “পরিবারের কারো চুলের দিকে দৃষ্টিপাত” বা “স্ত্রী/ছোট বালিকা হলে ভিন্ন কথা” — এমন কোনো বাক্য নেই। এটি সম্ভবত কোনো ভুল অনুবাদ বা ভিন্ন হাদিসের সাথে মিশ্রণ। মূল হাদিসটি শুধু দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেয়।

ফিকহি মাসআলা: পুরুষের জন্য নামাহরম নারীর প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দেওয়া হারাম। প্রথম দৃষ্টি যদি অনিচ্ছাকৃত হয়, তবে তা ক্ষমাযোগ্য; কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার তাকানো জায়েয নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৭; ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৩৫০)


২. “যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের দিকে ডাকলো সে তার বাবার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরলো” — এই হাদিসের মান

এই মর্মে বর্ণিত হাদিসটি হলো:

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «مَنْ دَعَا إِلَى الْعَصَبِيَّةِ فَهُوَ كَمَنْ أَخَذَ بِأَيْرِ أَبِيهِ»

সনদ পর্যালোচনা:

  • এই হাদিসটি ইমাম আহমাদ (রহ.) ‘মুসনাদ’ (১/৪০৭, ৪৪০)-এ, ইমাম তিরমিযী (রহ.) ‘সুনান’ (২৫১১)-এ, ইমাম নাসাঈ (রহ.) ‘সুনান’ (৪১৭৭)-এ বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেছেন: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ।
  • শায়খ আলবানী (রহ.) ‘সিলসিলা সহিহা’ (২৬৯)-এ সহিহ বলেছেন।

সিদ্ধান্ত: হাদিসটি হাসান পর্যায়ের, অর্থ সহিহ। তবে এখানে “জাতীয়তাবাদ” শব্দটি আরবি عَصَبِيَّة (আসাবিয়্যাহ)-এর অনুবাদ। এর অর্থ হলো — গোত্র, বংশ, ভাষা, অঞ্চল বা জাতভিত্তিক অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও ঘৃণা। ইসলামে এই আসাবিয়্যাহ নিষিদ্ধ। তবে ইসলামে দেশপ্রেম বা নিজের জাতির প্রতি ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; নিষিদ্ধ হলো অন্যায়ভাবে নিজের দলকে সমর্থন করা ও অন্যের প্রতি জুলুম করা।

ফিকহি মাসআলা: আসাবিয়্যাহ বা গোত্রীয়/জাতীয় অন্ধ পক্ষপাতিত্ব হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ» — “এটি পরিত্যাগ করো, কারণ এটি দুর্গন্ধযুক্ত।” (সহিহ বুখারী: ৩৫১৭; সহিহ মুসলিম: ২৫৮৪)


৩. খোরাসানের পূর্বদিক থেকে কালো পতাকা নিয়ে বাহিনী বের হওয়ার হাদিস

এই মর্মে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «تَخْرُجُ رَايَاتٌ سُودٌ مِنْ قِبَلِ الْمَشْرِقِ...»

সনদ পর্যালোচনা:

  • ইমাম তিরমিযী (রহ.) ‘সুনান’ (২২৬৯)-এ বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন: غَرِيبٌ।
  • ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) ‘সুনান’ (৪০৮২)-এ বর্ণনা করেছেন।
  • এই বাবের অধিকাংশ হাদিসের সনদে দুর্বলতা রয়েছে। ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁদের ‘সহিহ’ গ্রন্থে এই হাদিসটি বর্ণনা করেননি।
  • শায়খ আলবানী (রহ.) কিছু রেওয়ায়েতকে ‘সহিহ’ এবং কিছুকে ‘য'ঈফ’ বলেছেন।

সিদ্ধান্ত: এই বিষয়ক হাদিসগুলো মতভেদপূর্ণ। কিছু রেওয়ায়েত হাসান, কিছু য'ঈফ। তবে মুহাদ্দিসীনদের একটি বড় দল এগুলোকে ফিতান-সংক্রান্ত হাদিস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এগুলোকে আকিদার মূল ভিত্তি বানানো উচিত নয়; বরং ফিতান-সংক্রান্ত হাদিস হিসেবে বুঝতে হবে।

ফিকহি মাসআলা: ফিতান-সংক্রান্ত হাদিসগুলোতে সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে এই হাদিসের مصداق বলা যাবে না। (ফাতহুল বারী: ১৩/৭৯; ফাতাওয়া উসমানি: ১/৫৪০)


৪. হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী একই রকম হলেও হাদিসের মানে মতভেদ কেন?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উসূলি (মূলনীতি) প্রশ্ন। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:

(ক) রাবীদের স্মৃতিশক্তি ও নির্ভরযোগ্যতা ভিন্ন

হাদিসের মান নির্ধারণে শুধু রাবীর জীবনী নয়, বরং তার ضبط (স্মৃতিশক্তি), عدالة (নৈতিক নির্ভরযোগ্যতা), اتصال (সনদের ধারাবাহিকতা), شذوذ (বিরলতা) ও علة (গোপন ত্রুটি) — এই পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। দুজন রাবীর জীবনী একই রকম মনে হলেও তাদের ضبط ও ইত্তেকান ভিন্ন হতে পারে।

(খ) সনদের ধারাবাহিকতা (اتصال) ভিন্ন

একই রাবী থেকে একাধিক সনদে হাদিস বর্ণিত হতে পারে। কোনো সনদে انقطاع (বিচ্ছিন্নতা) থাকলে হাদিস য'ঈফ হয়, আবার অন্যটি متصل হলে সহিহ হয়।

(গ) শায ও ইল্লত (شذوذ ও علة)

কোনো রাবী নির্ভরযোগ্য হলেও যদি তিনি এমন কিছু বর্ণনা করেন যা তার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার বিপরীত হয়, তবে তা শায (বিরল) হয়ে যায়। আবার ظاهراً সহিহ সনদেও গোপন ত্রুটি (علة) থাকতে পারে, যা শুধু গভীর মুহাদ্দিসীন ধরতে পারেন।

(ঘ) মুহাদ্দিসীনদের মানদণ্ড ভিন্ন

ইমাম বুখারী (রহ.)-এর শর্ত, ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর শর্ত, ইমাম আবু দাউদ (রহ.)-এর শর্ত — সবাই এক নয়। ইমাম তিরমিযী (রহ.) ‘হাসান’ বললেও ইমাম বুখারী (রহ.) সেটিকে য'ঈফ বলতে পারেন।

(ঙ) হাদিসের মানে (متن) নয়, সনদ (سند) মূল

হাদিসের মান নির্ধারিত হয় সনদ ও মতন উভয়ের পর্যালোচনায়। শুধু রাবীর জীবনী পড়ে হাদিসের মান নির্ধারণ করা যায় না; বরং সনদের প্রতিটি স্তর, রাবীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, বর্ণনার সময়কাল, স্থান ইত্যাদি বিবেচনা করতে হয়।

উসূলি নীতি: ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’য় বলেন — হাদিসের মান নির্ধারণ একটি গভীর ইলম, যা শুধু রাবীর জীবনী পড়ে অর্জন করা যায় না; বরং এটি মুহাদ্দিসীনদের ইজতিহাদ ও ইজমার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

ফিকহি মাসআলা: সাধারণ মানুষের জন্য উচিত নয় নিজে হাদিসের মান নির্ধারণ করা। বরং নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা কর্তব্য। (উসূলুশ শাশী: পৃ. ২৮; ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৩০)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|----------| | আদাবুল মুফরাদ ৩৬৭ | হাসান-সহিহ; তবে উল্লিখিত অনুবাদ মূল হাদিসের নয় | | আসাবিয়্যাহ হাদিস | হাসান; আসাবিয়্যাহ হারাম | | খোরাসানের কালো পতাকা | মতভেদপূর্ণ; ফিতান-সংক্রান্ত, আকিদার ভিত্তি নয় | | হাদিসের মানে মতভেদ | সনদ, ضبط, اتصال, شذوذ, علة ও মুহাদ্দিসীনদের মানদণ্ডের ভিন্নতার কারণে |


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.