স্বপ্নে বারবার একই ব্যক্তিকে দেখা কি কোনো শরিয়তসম্মত ইঙ্গিত?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নটি মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটে জড়িত হলেও এর ফিকহি দিকটি হলো—স্বপ্ন দেখা বা বারবার একই ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা নিজে কোনো শরিয়তসম্মত বিধান বা ইবাদত নয়, বরং এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা। ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবির) একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র, তবে তা কুরআন-সুন্নাহর মূল বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং এটি ইজতেহাদি বিষয়। তাই কোনো স্বপ্নকে চূড়ান্ত দলিল বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
মূল বিষয়সমূহ:
১. স্বপ্ন তিন প্রকার: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—(ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (খ) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো বা দুঃস্বপ্ন, (গ) মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনা ও মনের গভীরে লুকানো আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। (সহিহ বুখারি: ৬৯৮৪, সহিহ মুসলিম: ২২৬৩)
আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি উক্ত ব্যক্তির সাথে কথা বলার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু মনের গভীরে বিষয়টি নিয়ে কিছু চিন্তা, উদ্বেগ বা অসম্পূর্ণ অনুভূতি থেকে যেতে পারে—এ ধরনের স্বপ্ন সাধারণত তৃতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। এটি শয়তানের প্ররোচনা বা নফসের প্রভাবও হতে পারে।
২. স্বপ্নকে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া: স্বপ্নের ভিত্তিতে কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন, বিয়ে করা বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া শরিয়তে বৈধ নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো হুকুম প্রমাণিত হয় না। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৩, দারুল ফিকর)
৩. পেরেশানির সমাধান: আপনি যেহেতু তালিবুল ইলম এবং দ্বীনের নিয়ম-কানুন মেনে চলার চেষ্টা করেন, তাই আপনার করণীয় হলো—
- স্বপ্নকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং এ নিয়ে বেশি চিন্তা না করা।
- নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে ঘুমানো এবং দুআ পড়া: «আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন শাররি হাযাল হুলুম» (হে আল্লাহ! আমি এই স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই)।
- ডান কাত হয়ে ঘুমানো এবং ঘুমের আগে অজু করা।
- উক্ত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা, তবে অবৈধ কথা-বার্তা বা সম্পর্কের দিকে না যাওয়া।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত করা, যাতে মনের অস্থিরতা দূর হয়।
৪. বিয়ের বিষয়ে: যদি উক্ত ব্যক্তি বা অন্য কেউ বৈধ প্রস্তাব দেয়, তাহলে শরিয়তসম্মত পন্থায় (অভিভাবকের মাধ্যমে, বিবাহের প্রস্তাব) বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের কারণে বা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি নীতি হলো—বিবাহের সিদ্ধান্ত হবে দ্বীনদারি, চরিত্র ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে, স্বপ্ন বা আবেগের ভিত্তিতে নয়। (আল-হিদায়া: ২/৩০৬)
৫. মনোযোগ সরানোর উপায়: আপনি যেহেতু ইলমের ছাত্রী, তাই পড়াশোনা, ইবাদত ও পরিবারের দায়িত্বে মনোযোগ বাড়ান। মনের খালি সময়ে শয়তান প্ররোচনা দেয়। ইমাম গাজালি (রহ.) «ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন»-এ বলেছেন, নফসকে খালি রাখলে সে অহেতুক চিন্তায় ডুবে যায়; তাই তাকে ইলম ও ইবাদতে ব্যস্ত রাখা কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ: বারবার একই ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা কোনো শরিয়তসম্মত ইঙ্গিত বা ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটি সাধারণত মনের চিন্তা, শয়তানের প্ররোচনা বা নফসের প্রভাব। আপনি দ্বীনদার ও ইলমের ছাত্রী হিসেবে স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, দুআ-ইস্তিগফার করুন এবং নিজের পড়াশোনা ও ইবাদতে মনোযোগ দিন। আল্লাহ আপনার মনের অস্থিরতা দূর করুন।
والله أعلم بالصواب