স্ত্রী দ্বীনদার না হলে স্বামী কি তালাক দিতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিবাহ: স্ত্রী দ্বীনদার না হলে তালাক দেওয়ার বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে):
হ্যাঁ, শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবে — তালাক দেওয়ার অধিকার স্বামীর রয়েছে এবং এর জন্য স্ত্রীর দ্বীনদার না হওয়া শর্ত নয়। তবে দ্বীনদার না হওয়া মাত্রই তালাক দেওয়া উত্তম বা কর্তব্য নয়; বরং আগে সংশোধনের চেষ্টা, ধৈর্য, দাওয়াত ও পরামর্শের মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কর্তব্য। যদি স্ত্রী দ্বীনের পথে চলতে অস্বীকার করে, দ্বীনি বিষয়ে বাধা দেয়, ফরজ-ওয়াজিব পালনে বাধা দেয়, চরিত্রহীনতায় লিপ্ত হয় বা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসহনীয় হয়ে পড়ে — তখন তালাক দেওয়া জায়েজ, বরং কখনো কখনো উত্তমও হতে পারে। কিন্তু শুধু দ্বীনি বুঝ না থাকার কারণে তালাক দেওয়া তাড়াহুড়ো ও অবিবেচনার কাজ হবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. তালাকের অধিকার কার?
ইসলামে তালাকের অধিকার মূলত স্বামীর হাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
“তালাক দুইবার। এরপর হয় যথাবিধি সংসার ধারণ করবে, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেবে।”
— (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দেবে, তখন ইদ্দতের হিসাব রেখে তালাক দেবে।”
— (সূরা আত-তালাক: ১)
সুতরাং স্বামীর তালাক দেওয়ার অধিকার শরীয়তসিদ্ধ। স্ত্রী দ্বীনদার না হলে এই অধিকার বিলুপ্ত হয় না।
২. দ্বীনদার না হওয়া কি তালাকের বৈধ কারণ?
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
“নারীর সাথে বিবাহ হয় চারটি কারণে — তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারির জন্য। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, নইলে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
— (সহিহ বুখারি: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)
এই হাদিস প্রমাণ করে, দ্বীনদারি বিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কিন্তু এটি তালাকের সরাসরি নির্দেশ নয়; বরং বিবাহের পূর্বে দ্বীনদার স্ত্রী নির্বাচনের নির্দেশ।
৩. দ্বীনদার না হলে করণীয় ধাপসমূহ
প্রথম ধাপ — দাওয়াত ও পরামর্শ:
স্বামী প্রথমে স্ত্রীকে ভালোবাসা, স্নেহ ও হিকমতের সাথে দ্বীনের দাওয়াত দেবে। আল্লাহ বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
— (সূরা আন-নিসা: ১৯)
দ্বিতীয় ধাপ — ধৈর্য ও দুআ:
স্ত্রীর সংশোধনের জন্য দুআ করবে, ধৈর্য ধারণ করবে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
وَمَنْ يَصْبِرْ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ
“যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যের শক্তি দান করেন।”
— (সহিহ বুখারি: ১৪৬৯)
তৃতীয় ধাপ — নসিহত ও বিচ্ছেদের সতর্কতা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ۖ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا
“যে স্ত্রীদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, শয্যা ত্যাগ করো এবং (প্রয়োজনে) হালকাভাবে আঘাত করো। যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ খোঁজো না।”
— (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
চতুর্থ ধাপ — সালিশ:
আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا
“যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে এক সালিশকারী তার পরিবার থেকে এবং এক সালিশকারী তার পরিবার থেকে নিয়োগ করো।”
— (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
পঞ্চম ধাপ — তালাক:
উপরের সব ধাপ ব্যর্থ হলে এবং সংসার টিকিয়ে রাখা অসহনীয় হলে তালাক দেওয়া জায়েজ।
৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন, তালাক দেওয়া স্বামীর অধিকার; তবে বিনা কারণে তালাক দেওয়া মাকরুহ। তিনি লেখেন:
“তালাক দেওয়া বৈধ, কিন্তু কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া মাকরুহ তাহরিমি।”
— (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২২৯)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:
“স্বামী যখন ইচ্ছা তালাক দিতে পারে; তবে বিনা প্রয়োজনে তালাক দেওয়া নিন্দনীয়।”
— (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৩৫৩)
বাদায়েউস সানায়ে-তে বলা হয়েছে:
“তালাক স্বামীর অধিকার, তবে তা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল।”
— (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১৭)
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।”
— (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)
৫. দ্বীনদার না হওয়ার বিভিন্ন স্তর
| অবস্থা | বিধান | |---|---| | স্ত্রী দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন, কিন্তু ফরজ-ওয়াজিব পালনে বাধা দেয় না | তালাক দেওয়া জায়েজ, তবে মাকরুহ; ধৈর্য ও দাওয়াত কর্তব্য | | স্ত্রী ফরজ-ওয়াজিব পালনে বাধা দেয়, দ্বীনি শিক্ষায় বাধা দেয় | তালাক দেওয়া জায়েজ, বরং কখনো উত্তম | | স্ত্রী চরিত্রহীনতায় লিপ্ত, যিনা-অশ্লীলতায় জড়িত | তালাক দেওয়া জায়েজ ও উত্তম | | স্ত্রী দ্বীন থেকে মুরতাদ হয়ে যায় | তালাক দেওয়া জায়েজ; বরং কর্তব্য | | স্ত্রী দ্বীনদার, কিন্তু স্বামী দ্বীনদার নয় | এখানে তালাকের প্রশ্ন নয়; স্বামীর উচিত নিজে সংশোধন হওয়া |
৬. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. তাড়াহুড়ো করবেন না। দ্বীনদারি একটি ধীর প্রক্রিয়া; অনেক সময় বছর লেগে যায়।
২. নিজের দ্বীনি দায়িত্ব পালন করুন। আপনি নিজে দ্বীনদার হলে স্ত্রীও প্রভাবিত হতে পারে।
৩. পরিবারের বড়দের ও আলেমদের পরামর্শ নিন।
৪. তালাকের আগে ইস্তিখারা করুন।
৫. সন্তান থাকলে তাদের কথা ভাবুন।
৬. তালাক দিলে ইদ্দত ও হক আদায় করুন। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ
“তোমরা নিজেদের মধ্যে সৌজন্য ভুলে যেয়ো না।”
— (সূরা আল-বাকারা: ২৩৭)
সারসংক্ষেপ
- তালাক দেওয়ার অধিকার স্বামীর আছে; স্ত্রী দ্বীনদার না হলেও এই অধিকার থাকে।
- শুধু দ্বীনি বুঝ না থাকার কারণে তালাক দেওয়া জায়েজ, কিন্তু মাকরুহ।
- স্ত্রী দ্বীনি বিধান পালনে বাধা দিলে, চরিত্রহীনতায় লিপ্ত হলে বা মুরতাদ হলে তালাক দেওয়া জায়েজ, বরং উত্তম।
- প্রথমে দাওয়াত, পরামর্শ, ধৈর্য, দুআ ও সালিশের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা কর্তব্য।
- তালাক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল; তাই বিনা কারণে তালাক দেওয়া উচিত নয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।