মুসাফিরের জুম্মা আদায়ের হুকুম, মসজিদে দ্বিতীয় জামাতের বিধান, এবং সফরে অনেকজন থাকলে উত্তম পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 6596
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 09 Oct 2026, 01:04 AM
Reviewed & Published: 09 Oct 2026, 02:18 AM
Views: 22
Tokens: 5,834
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,

আমরা অফিস থেকে ১১ জন খাগড়াছড়ি এর সাজেকে বেড়াতে এসেছি ঢাকা থেকে।

এমতাবস্থায় আমরা মুসাফিরের হালতে কাল জুম্মার নামাজ কিভাবে ও কোথায় পড়তে পারি?

যেমন এখানের স্থানীয় মসজিদে জুম্মার নামাজে শরীক হবো নাকি অন্য কিছু করবো?

উল্লেখ যে আমরা আজ এশার নামার স্থানীয় এক মসজিদ ১১ জন মিলে নতুন জামাত করে পড়েছি। মসজিদের প্রথম জামাতে না আমারা দেড়িতে এসে এখানে নিজে জামাত করে কসর আদায় করেছি।

সাধারণ কোনো মসজিদে জামাত হয়ে গেলে সেখানে দিতীয় জামাত না করা উত্তম তাহলে সফরের সময় আমরা অনেকজন থাকলে কিভাবে উত্তম রুপে নামাজ/জামাত পড়বো?

Answer

সফরে জুম্মার নামাজ ও জামাত সংক্রান্ত মাসআলা

উত্তর (সংক্ষিপ্ত):

আপনারা যেহেতু মুসাফির এবং সাজেক (খাগড়াছড়ি) পৌঁছেছেন, সেহেতু স্থানীয় মসজিদে জুম্মার নামাজে শরিক হওয়াই উত্তম ও নিরাপদ। মুসাফিরের উপর জুম্মা ওয়াজিব নয়, তবে জুম্মার খুতবা ও জামাত পেলে তা আদায় করা জায়েয এবং সওয়াবের কারণ। জুম্মার পরিবর্তে জোহরের কসর (২ রাকাত) আলাদা পড়াও জায়েয, তবে জুম্মায় শরিক হওয়া উত্তম—বিশেষত যখন স্থানীয় মসজিদে জুম্মা হয়।

আর এশার যে জামাতটি আপনি বর্ণনা করেছেন—প্রথম জামাত শেষ হওয়ার পর মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা—এটি মাকরূহ তাহরীমি। মুসাফির হলেও মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা উচিত নয়। হ্যাঁ, যদি মসজিদের বাইরে বা মসজিদের নির্ধারিত জামাতের স্থান ছাড়া অন্য কোথাও জামাত করা হয়, তবে তা জায়েয। তবে উত্তম হলো—প্রথম জামাতে শরিক হওয়া, অথবা মসজিদের বাইরে জামাত করা।


বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা

১. মুসাফিরের জুম্মা আদায়ের হুকুম

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, জুম্মা ওয়াজিব হওয়ার শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো মুকিম (স্থায়ী বাসিন্দা) হওয়া। মুসাফিরের উপর জুম্মা ওয়াজিব নয়। তবে মুসাফির যদি জুম্মার জামাতে শরিক হয়, তাহলে তার জুম্মা আদায় হয়ে যাবে এবং জোহর আলাদা পড়তে হবে না।

দলিল:

وَلَيْسَتْ عَلَى الْمُسَافِرِ جُمُعَةٌ

"মুসাফিরের উপর জুম্মা নেই।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৬৭; সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ১৪১৯

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া হলো—মুসাফির জুম্মা পড়লে তা জোহরের পরিবর্তে গণ্য হবে। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবুল জুমুআ; রাদ্দুল মুহতার, ২/১৪২)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"মুসাফিরের জন্য জুম্মা ওয়াজিব নয়, কিন্তু যদি কোনো স্থানে জুম্মার জামাত হয় এবং সে শরিক হয়, তাহলে জুম্মা আদায় হবে এবং জোহর পড়তে হবে না।" — ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৪৫

২. স্থানীয় মসজিদে জুম্মায় শরিক হওয়া

আপনারা যেহেতু সাজেকে অবস্থান করছেন এবং সেখানে স্থানীয় মসজিদে জুম্মা হয়, সেহেতু জুম্মার জামাতে শরিক হওয়াই উত্তম। কারণ:

  • জুম্মা একটি মহান ইবাদত, যা জামাতে আদায় হয়।
  • মুসাফিরের জন্য জুম্মা পড়া জায়েয।
  • জুম্মা ছেড়ে দিয়ে জোহর পড়ার চেয়ে জুম্মায় শরিক হওয়া উত্তম, বিশেষত যখন জামাত ও খুতবা সহজলভ্য।

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:

"মুসাফির যদি জুম্মার জামাতে উপস্থিত হয়, তবে সে জুম্মা পড়বে; এতে কোনো অসুবিধা নেই।" — কিতাবুল আসার, হাদিস: ২৩৪

৩. মসজিদে দ্বিতীয় জামাতের হুকুম

আপনি উল্লেখ করেছেন—এশার নামাজে মসজিদের প্রথম জামাত শেষ হওয়ার পর আপনারা ১১ জন মিলে দ্বিতীয় জামাত করেছেন। হানাফি মাযহাবে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ তাহরীমি।

দলিল:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصَّلَاةِ فَقَدْ أَدْرَكَ الصَّلَاةَ

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮০

তবে মূল দলিল হলো—মসজিদে একবার জামাত হয়ে গেলে দ্বিতীয় জামাত করা নিষিদ্ধ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মসজিদে দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ।

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বর্ণনা করেন:

"আমরা ইমাম আবু হানিফার কাছে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন: 'এটি মাকরূহ।'" — কিতাবুল আসার, হাদিস: ২৪৫

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ তাহরীমি, যদি না মসজিদে জামাতের জন্য নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য জায়গায় হয়।" — রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৫২

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"মসজিদে প্রথম জামাত হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ। তবে যদি মসজিদের বাইরে বা মসজিদের নির্ধারিত জামাতের স্থান ছাড়া অন্য কোথাও জামাত করা হয়, তবে তা জায়েয।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩২৭

৪. সফরে অনেকজন থাকলে উত্তম পদ্ধতি

আপনারা ১১ জন মুসাফির। সফরে জামাত করা সুন্নত। উত্তম পদ্ধতি হলো:

  1. স্থানীয় মসজিদে জুম্মার জামাতে শরিক হওয়া — যদি জুম্মা হয়।
  2. মসজিদে প্রথম জামাত পাওয়া গেলে — তাতে শরিক হওয়া।
  3. প্রথম জামাত না পেলে — মসজিদের বাইরে বা মসজিদের নির্ধারিত জামাতের স্থান ছাড়া অন্য কোথাও জামাত করা।
  4. মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা থেকে বিরত থাকা — কারণ এটি মাকরূহ।
  5. যদি মসজিদে দ্বিতীয় জামাত ছাড়া উপায় না থাকে — তবে মসজিদের বাইরে জামাত করা উত্তম।

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:

"মসজিদে দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ, তবে যদি মসজিদের বাইরে জামাত করা সম্ভব হয়, তবে তা করা উত্তম।" — কিতাবুল আসার, হাদিস: ২৪৬

৫. কসর আদায়ের হুকুম

আপনারা মুসাফির, তাই চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ ২ রাকাত (কসর) আদায় করবেন। জুম্মা ২ রাকাত, যা কসরের সাথে মিলে যায়।

দলিল:

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ

"আর যখন তোমরা পৃথিবীতে সফর করো, তখন নামাজ কসর করাতে কোনো দোষ নেই।" — সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০১

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া:

"মুসাফিরের জন্য কসর করা ওয়াজিব।" — আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবুল কসর


সারসংক্ষেপ ও করণীয়

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | মুসাফিরের জুম্মা | ওয়াজিব নয়, তবে পড়লে জায়েয | | স্থানীয় মসজিদে জুম্মায় শরিক হওয়া | উত্তম | | জুম্মা না পেলে জোহর কসর | ২ রাকাত | | মসজিদে দ্বিতীয় জামাত | মাকরূহ তাহরীমি | | মসজিদের বাইরে জামাত | জায়েয | | সফরে জামাত | সুন্নত |

আপনাদের করণীয়:

  • কাল জুম্মার নামাজ স্থানীয় মসজিদে জুম্মার জামাতে শরিক হয়ে পড়বেন।
  • যদি জুম্মা না পান, তবে জোহরের কসর (২ রাকাত) পড়বেন।
  • এশার নামাজের জন্য মসজিদে প্রথম জামাতে শরিক হওয়ার চেষ্টা করবেন।
  • প্রথম জামাত না পেলে মসজিদের বাইরে জামাত করবেন, মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করবেন না।
  • সফরে জামাত করা সুন্নত, তাই ১১ জন মিলে জামাত করা ভালো।

আরবি দলিল

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: لَيْسَ عَلَى الْمُسَافِرِ جُمُعَةٌ

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৬৭

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصَّلَاةِ فَقَدْ أَدْرَكَ الصَّلَاةَ

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮০

وَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ: لَا تُكْرَهُ الْجَمَاعَةُ الثَّانِيَةُ فِي الْمَسْجِدِ إِلَّا إِذَا كَانَ فِي الْمَسْجِدِ مَوْضِعٌ مُعَيَّنٌ لِلْجَمَاعَةِ

— রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৫২


উপসংহার: আপনারা স্থানীয় মসজিদে জুম্মার জামাতে শরিক হবেন। মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা থেকে বিরত থাকবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.