রাস্তায় পড়ে থাকা আল্লাহ, রাসূল (ﷺ) ও বিসমিল্লাহ লেখা কাগজ না তোলায় গুনাহ ও ইমানের প্রভাব।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।কারও নামের আগে আবদুল বা আবদুর পরে আল্লাহ পাক এর নাম লিখা যেমন আবদুল কুদ্দুস লিখা পোস্টার বা অন্য কিছুতে ঠিকমত সম্মান দেওয়া সম্ভব হয়না। উদাহরণ হাতপাখা ব্যাবহার করে বিছানায় রাখা হয় কারও পা লাগতে পারে বাচ্চাদের প্রসাব লাগতে পারে এখন কি গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে?
৩।কারও নামের আগে এবং পরে মোহাম্মদ আহমেদ লিখা থাকে সেই রকম পোস্টার বা অন্য কিছুকে পারা দিলে সম্মান না দেখালে কি গোনাহ হবে বা ইমানে সমস্যা হবে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো। প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব ও ফতোয়ার উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ১: রাস্তায় আল্লাহ, রাসূল, বিসমিল্লাহ ইত্যাদি লেখা কাগজ না তোলার কারণে গুনাহ ও ইমানের সমস্যা?
উত্তর:
রাস্তায় বা বাজারে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নাম বা পবিত্র বাক্য যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা কাগজ পড়ে থাকলে তা দেখে তোলা ও সম্মানের স্থানে রাখা মুস্তাহাব এবং সুন্নাতের প্রতি যত্নের অংশ। তবে যদি কোনো ব্যক্তি সেগুলো না তোলে, তবে শুধু না তোলার কারণে সরাসরি গুনাহ হবে না বা ইমানের সমস্যা হবে না, যতক্ষণ না সে অবজ্ঞা বা অসম্মানের উদ্দেশ্যে তা ফেলে রাখে। তবে শরিয়তের নির্দেশ হলো, পবিত্র নামসমূহকে অপমান থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। যদি দেখার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে না তোলে এবং সেগুলো পায়ের নিচে পড়ে বা অসম্মানিত হয়, তাহলে সে গুনাহগার হবে। আর যদি কেউ তোলে, তাহলে সওয়াব লাভ করবে।
সতর্কতা: জনসমক্ষে উঠাতে লজ্জা বা মানুষের ভয় করলে গোপনে উঠানোর চেষ্টা করা উচিত।
সূত্র:
- ফাতওয়ায়ে উসমানী (১/২৮১): “আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াত যেখানে অসম্মানিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেখান থেকে সরানো ওয়াজিব।”
- রদ্দুল মুহতার (৫/২৬৭-২৬৮): “পবিত্র নামসমূহকে অপবিত্র স্থানে রাখা বা পড়ে থাকতে দেওয়া মাকরূহে তাহরীমি।”
- ইমদাদুল ফাতওয়া (৪/২১৮): “যদি নিজে না তোলে, কিন্তু অন্য কেউ তুললে সম্মান হয়, তাহলে গুনাহ নেই। কিন্তু যদি দেখা সত্ত্বেও তাতে অসম্মান হয়, তবে গুনাহ হবে।”
গুনাহ ও ইমান:
শুধু না তোলায় ইমান নষ্ট হবে না, তবে অবহেলা করলে গুনাহ হয়। ইমান নিয়ে সমস্যা হবে যদি কেউ আল্লাহ ও রাসূলের নামের প্রতি অবজ্ঞা পোষণ করে বা হালকাভাবে নেয়।
প্রশ্ন ২: ‘আবদুল কুদ্দুস’ ইত্যাদি নামসম্বলিত কাগজ সম্মান না করলে গুনাহ ও ইমানের সমস্যা?
উত্তর:
‘আবদুল কুদ্দুস’ বা ‘আবদুল্লাহ’-এর মত নামসমূহে ‘আবদ’ (দাস) এবং ‘কুদ্দুস’ (আল্লাহর পবিত্র নাম) যুক্ত। তাই এ জাতীয় নাম লেখা কাগজপত্রের প্রতি সম্মান দেখানো ওয়াজিব। কারণ এতে আল্লাহর নাম বা গুণ বিদ্যমান। যদি এমন কাগজ হাতপাখায় ব্যবহার করা হয়, বিছানায় রেখে দেওয়া হয় এবং তাতে পা, থুথু, বাচ্চার প্রস্রাব ইত্যাদি লাগার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা জায়েজ নেই এবং গুনাহ হবে। তবে যদি সেটি অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি হয় এবং আপনার নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে ব্যক্তিগতভাবে আপনার গুনাহ হবে না, তবে বিষয়টি দেখলে সতর্ক করা উচিত।
সূত্র:
- ফাতওয়ায়ে উসমানী (৩/১৪২): “যেসব কাগজে ‘আবদুল্লাহ’, ‘আবদুর রহমান’ ইত্যাদি লিখা থাকে, সেগুলোকেও সম্মান করা জরুরি, কারণ তাতে আল্লাহর নাম ও গুণ বিদ্যমান।”
- রদ্দুল মুহতার (১/২২৭): “আল্লাহর নামসমূহ অসম্মানের স্থান থেকে সংরক্ষণ করা ফরজ।”
- ইমদাদুল ফাতওয়া (৪/২১৯): “যদি এই নামগুলো অপবিত্র স্থানে ফেলা হয় বা অসম্মানিত হয়, তাহলে গুনাহ হবে।”
গুনাহ ও ইমান:
গুনাহ হবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্মানজনক স্থানে রাখা হয় বা তা হতে দেওয়া হয়। তবে ইমান নষ্ট হবে না, যতক্ষণ না কেউ নিজেকে হালাল মনে করে বা অবজ্ঞার মনোভাব পোষণ করে।
প্রশ্ন ৩: ‘মুহাম্মদ আহমদ’ ইত্যাদি নামসম্বলিত কাগজের প্রতি সম্মান না দেখালে গুনাহ ও ইমানের সমস্যা?
উত্তর:
মহানবী ﷺ-এর নাম ‘মুহাম্মদ’ এবং ‘আহমদ’-এ সেগুলোর প্রতি চরম সম্মান ওয়াজিব। তাই যেসব কাগজে বা পোস্টারে এমন নাম লেখা আছে, সেগুলোকে অপমানজনক স্থানে রাখা, ফেলে দেওয়া বা পায়ের নিচে পড়তে দেওয়া হারাম এবং কবীরা গুনাহ। যদি কেউ নিজের ইচ্ছায় সেগুলো অসম্মান করে বা তা হতে দেয়, তবে গুনাহ হবে। কিন্তু যদি অন্যজনের কাগজ হয় এবং আপনি তাতে কোনো হস্তক্ষেপ না করেন, তবে আপনার গুনাহ নেই। তবে দেখলে সতর্ক করা এবং সম্ভব হলে সম্মানের স্থানে রাখার জন্য অনুরোধ করা উচিত।
সূত্র:
- ফাতওয়ায়ে আলমগীরী (৫/৩৫১): “নবী ﷺ-এর নাম ও তাঁর আনুষাঙ্গিক সকল বস্তু সম্মান করা ফরজ।”
- শারহু মা‘আনিল আসার (৪/৩৬০): “যে ব্যক্তি নবী ﷺ-এর নামকে হালকাভাবে নেয়, সে কুফর ও গোমরাহির মধ্যে পতিত হয়।”
- ফাতওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ (১/৪৭৫): “‘মুহাম্মদ’ নাম লেখা কাগজ পুড়ানো বা পদদলিত করা হারাম; বরং সম্মানজনক স্থানে রাখতে হবে।”
গুনাহ ও ইমান:
ইচ্ছাকৃত অসম্মান করলে বা করাতে দিলে গুনাহের পাশাপাশি ইমানের জন্যও হুমকি হতে পারে। কিন্তু অজান্তে বা অসতর্কতায় যদি হয়, তবে তওবা করতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
১. রাস্তায় পবিত্র নাম পড়ে থাকলে: দেখে না তোলায় সরাসরি গুনাহ নয়, কিন্তু অসম্মানের কারণ হলে গুনাহ। ইমানের সমস্যা হবে না।
২. ‘আবদুল কুদ্দুস’ প্রভৃতি নাম: সম্মান না করলে গুনাহ, ইমান নষ্ট নয়।
৩. ‘মুহাম্মদ’, ‘আহমদ’ প্রভৃতি নাম: ইচ্ছাকৃত অসম্মান হারাম; ইমানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
পরামর্শ: সকল পবিত্র নাম ও বাক্য সম্মানের স্থানে সরানোর চেষ্টা করুন। লোকলাজ বা উচ্ছৃঙ্খলতা পরিহার করে অন্তত গোপনে উঠিয়ে একটি পবিত্র স্থানে (মসজিদ, কুরআনের জায়নামাজের নিচে ইত্যাদি) রাখুন। যদি নিজে না তুলতে পারেন, তবে অন্য কাউকে তোলার জন্য বলুন। আর যে কাগজে নাম আছে, সেগুলোকে অপবিত্র স্থানে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।