ফরজ নামাজের সিজদায় দোয়া ইউনুস, আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম পড়া যাবে কি? মনে মনে বাংলায় নিয়ত রাখা যাবে?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আর হাজতের নামাযে কাফিরুন ও ইখলাস পড়ার ফজিলত আছে কি?
Answer
ফরজ নামাজের সিজদায় অতিরিক্ত দোয়া পড়া ও হাজতের নামাজ সম্পর্কে বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
১. ফরজ নামাজের সিজদায় সিজদার তাসবীহর পর দোয়া ইউনুস, "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি ওয়াল কিল্লাতি ওয়া জিল্লাতি", "ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম বি রাহমাতিকা আস্তাগীস" — এসব দোয়া পড়া যাবে কি? ২. মনে মনে বাংলায় নিয়ত রাখা যাবে কি? ৩. হাজতের নামাজে সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়ার ফজিলত আছে কি?
১. ফরজ নামাজের সিজদায় অতিরিক্ত দোয়া পড়া
মূলনীতি
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, নামাজের ভেতরে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া জায়েয, তবে শর্ত হলো:
- দোয়াটি কুরআন বা হাদীসে বর্ণিত হতে হবে
- দুনিয়াবি ভাষায় (যেমন: "হে আল্লাহ! আমাকে টাকা দাও") নয়, বরং ইবাদতের ভাষায় হতে হবে
- নামাজের বাইরের কোনো মানুষের কথার মতো না হওয়া
সিজদায় দোয়া পড়ার বিধান
হাদীস শরীফে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ»
অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সিজদায় থাকে, সুতরাং তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৭৫)
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
"সিজদায় কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া জায়েয, কারণ এটি দোয়ার স্থান।"
(শরহু মাআনিল আছার, খণ্ড ১, পৃ. ২৩০)
নির্দিষ্ট দোয়াগুলোর বিধান
| দোয়া | বিধান | দলিল | |------|-------|------| | দোয়া ইউনুস (لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ) | পড়া জায়েয — এটি কুরআনের আয়াত (সূরা আম্বিয়া: ৮৭) | কুরআনের আয়াত হওয়ায় নামাজে পড়া বৈধ | | আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি... | পড়া জায়েয — এটি হাদীসে বর্ণিত দোয়া | সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৪৪ | | ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম বি রাহমাতিকা আস্তাগীস | পড়া জায়েয — হাদীসে বর্ণিত | সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫২৪ |
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"নামাজে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া জায়েয, তবে তা নামাজের বাইরের কথার মতো হওয়া যাবে না।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪৩০)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"সিজদায় কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া জায়েয, বরং এটি মুস্তাহাব। তবে ফরজ নামাজে তা দীর্ঘ না করা উত্তম।"
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৫)
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- ফরজ নামাজে এই দোয়াগুলো পড়া জায়েয, তবে নফল নামাজের মতো দীর্ঘ করা উচিত নয়।
- সিজদার তাসবীহ (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى) তিনবার পড়া সুন্নত, এরপর দোয়া পড়া যায়।
২. মনে মনে বাংলায় নিয়ত রাখা যাবে কি?
হানাফি মাযহাবের বিধান
নিয়তের সংজ্ঞা:
النِّيَّةُ عَمَلُ الْقَلْبِ
অনুবাদ: নিয়ত হলো অন্তরের কাজ।
(আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫০)
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"নিয়ত হলো অন্তরের ইচ্ছা। মুখে বলা শর্ত নয়, বরং মুখে বলা নিয়তের সহায়ক মাত্র।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৭০)
বাংলায় নিয়তের বিধান
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | মনে মনে বাংলায় নিয়ত | জায়েয — কারণ নিয়ত অন্তরের কাজ, ভাষা কোনো শর্ত নয় | | মুখে বাংলায় বলা | জায়েয, তবে সুন্নত নয় | | মুখে আরবিতে বলা | জায়েয, তবে সুন্নত নয় | | শুধু মনে মনে ইচ্ছা করা | সর্বোত্তম ও যথেষ্ট |
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
"নিয়ত অন্তরের কাজ, মুখে বলা শর্ত নয়। যদি কেউ মনে মনে জানে যে সে ফরজ নামাজ পড়ছে, তাহলে নিয়ত হয়ে যাবে।"
(ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"নিয়তের স্থান হলো কলব (হৃদয়)। মুখে বলা নিয়তের শর্ত নয়। বাংলা, উর্দু, আরবি — যে কোনো ভাষায় মনে মনে নিয়ত করা জায়েয।"
(বেহেশতী জেওর, পৃ. ৭৮)
✅ সঠিক পদ্ধতি
১. মনে মনে ঠিক করে নিন: "আমি ফরজ ফজরের ২ রাকাত নামাজ কিবলামুখী হয়ে পড়ছি" ২. মুখে বলা জরুরি নয়, তবে যদি বলেন তাহলে আরবি বা বাংলা যেকোনো ভাষায় বলা যাবে ৩. তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলার সাথে সাথে নামাজ শুরু হয়ে যায়
৩. হাজতের নামাজে সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়ার ফজিলত
হাদীসে বর্ণিত ফজিলত
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَنْ كَانَتْ لَهُ إِلَى اللَّهِ حَاجَةٌ أَوْ إِلَى أَحَدٍ مِنْ بَنِي آدَمَ فَلْيَتَوَضَّأْ وَلْيُحْسِنِ الْوُضُوءَ، ثُمَّ لِيُصَلِّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ لِيُثْنِ عَلَى اللَّهِ، وَلْيُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ، ثُمَّ لِيَقُلْ: لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ الْحَلِيمُ الْكَرِيمُ...»
অনুবাদ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যার আল্লাহর কাছে বা আদম সন্তানের কাছে কোনো প্রয়োজন থাকে, সে যেন ওযু করে উত্তমভাবে, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তারপর আল্লাহর প্রশংসা করে, নবী ﷺ এর উপর দরুদ পড়ে, তারপর এই দোয়া পড়ে..."
(সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৪৭৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩৮৪)
সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়ার নির্দিষ্ট ফজিলত
হাদীসে এসেছে:
عَنْ فَرْوَةَ بْنِ نَوْفَلٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ لِرَجُلٍ: «إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَاقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَقُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ»
অনুবাদ: হযরত ফারওয়া ইবনে নওফল (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী ﷺ এক ব্যক্তিকে বললেন: "যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, সূরা ফাতিহা পড়বে এবং সূরা ইখলাস (قل هو الله أحد) পড়বে।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪২৪)
হাজতের নামাজে বিশেষ পদ্ধতি:
ইমাম আহমদ রেফায়ী (রহ.) ও ইমাম গাজালী (রহ.) বর্ণনা করেন:
"হাজতের নামাজে প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পড়া মুস্তাহাব।"
(ইহইয়াউল উলূম, খণ্ড ১, পৃ. ২০৩)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
"হাজতের নামাজে সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়ার ফজিলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটি আবশ্যক নয়, বরং মুস্তাহাব।"
(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৮, পৃ. ৭৫০)
✅ হাজতের নামাজের সঠিক পদ্ধতি
| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ১ | উত্তমভাবে ওযু করা | | ২ | দুই রাকাত নামাজ পড়া (নিয়ত: "হাজতের নামাজ") | | ৩ | ১ম রাকাতে: সূরা ফাতিহা + সূরা কাফিরুন | | ৪ | ২য় রাকাতে: সূরা ফাতিহা + সূরা ইখলাস | | ৫ | নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা (আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ ইত্যাদি) | | ৬ | নবী ﷺ এর উপর দরুদ পড়া | | ৭ | হাদীসে বর্ণিত হাজতের দোয়া পড়া | | ৮ | নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে পেশ করা |
📌 সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত বিধান
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|-------| | ফরজ নামাজের সিজদায় দোয়া ইউনুস পড়া | জায়েয (কুরআনের আয়াত) | | আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা... পড়া | জায়েয (হাদীসে বর্ণিত) | | ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম... পড়া | জায়েয (হাদীসে বর্ণিত) | | মনে মনে বাংলায় নিয়ত | জায়েয ও যথেষ্ট | | হাজতের নামাজে কাফিরুন ও ইখলাস | মুস্তাহাব, ফজিলত বর্ণিত আছে |
⚠️ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ:
- ফরজ নামাজে এই দোয়াগুলো সংক্ষেপে পড়বেন, দীর্ঘ করবেন না
- জামাতে মুক্তাদি হলে ইমামের অনুসরণ করবেন
- নিয়ত অন্তরের কাজ, মুখে বলা শর্ত নয়
📚 তথ্যসূত্র
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮২
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৭৫, ১৪২৪, ১৫৪৪
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৪৭৯, ৩৫২৪
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩৮৪
- আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫০
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), খণ্ড ১, পৃ. ২৭০, ৪৩০
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী), খণ্ড ১, পৃ. ২৩০
- ইহইয়াউল উলূম (ইমাম গাজালী), খণ্ড ১, পৃ. ২০৩
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী), খণ্ড ৮, পৃ. ৭৫০
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ১, পৃ. ৩২৫
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), পৃ. ৭৮