ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের টাকা ভাগনে বা আত্মীয়কে দেওয়া যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
তাদের আর্থিক কিছু সমস্যা আছে নিজেদের রুম করবে ১টা তাই দিতে চাচ্ছিল।
Answer
ব্যাংকের ইন্টারেস্টের টাকা নিজের বোনের ছেলেকে দেওয়া যাবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের ইন্টারেস্টের টাকা নিজের বোনের ছেলেকে (ভাগনে) দেওয়া যাবে কি না — তাদের আর্থিক সমস্যা আছে, একটি রুম ভাড়া নিতে তারা এই টাকা চাচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ব্যাংকের সুদ (ইন্টারেস্ট) সম্পূর্ণ হারাম ও নাপাক মাল। এটি নিজের ব্যবহারে আনা, খাওয়া, পরিধান করা বা কারো মালিকানায় দেওয়া জায়েয নয়। তবে সুদি টাকা গরিব-মিসকিনকে (যাদের মালিকানা ছাড়া) সদকা হিসেবে দেওয়া যাবে — এতে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সুযোগ আছে, কিন্তু সওয়াবের আশা করা যাবে না।
আপনার ভাগনে যদি প্রকৃত গরিব/মিসকিন হয় এবং তাকে হিবা/উপহার বা ঋণ হিসেবে নয়, বরং সদকা হিসেবে দেওয়া হয়, তাহলে ফকিহদের একটি বড় জামাতের মতে তা জায়েয।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা
১. সুদ সম্পূর্ণ হারাম
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, দানকারী, লেখক ও সাক্ষী — সকলের উপর লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
২. সুদের টাকা "খবিস" — পবিত্র নয়
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, সুদের মাল খবিস (নাপাক)। এটি আল্লাহর পথে দান করলেও কবুল হয় না, বরং তা নষ্ট করা কর্তব্য।
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
"الربا خبيث لا يجوز التصدق به ولا الانتفاع به بل يجب رده على صاحبه إن كان معلوماً وإلا فالتصدق به على الفقراء" "সুদ খবিস; তা সদকা করা বা তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়; বরং মালিক জানা থাকলে তাকে ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় গরিবদের সদকা করতে হবে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
৩. হানাফি ফকিহদের বিশ্লেষণ
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ লিখেন:
"সুদি টাকা মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে গরিব-মিসকিনকে সদকা করা ওয়াজিব; তবে তাতে সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না, বরং নাজাতের নিয়ত হবে।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" (২/৩৩৫)-এ বলেন:
"সুদি টাকা ব্যাংক থেকে নিয়ে গরিবকে সদকা করা জায়েয, কিন্তু নিজের জন্য রাখা বা ধনীকে দেওয়া জায়েয নয়।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "ইমদাদুল ফাতাওয়া"-তে বলেন:
"সুদি টাকা দিয়ে কাউকে সাহায্য করা মানে তাকে নাপাক মালের মালিক বানানো — এটি জায়েয নয়। তবে গরিবকে সদকা হিসেবে দেওয়া যাবে, যাতে সে মালিক না হয়ে ভোগ করতে পারে।"
৪. আপনার ভাগনের ক্ষেত্রে করণীয়
আপনার ভাগনে যদি প্রকৃত গরিব/মিসকিন হয় (যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই), তাহলে:
✅ যা করা যাবে:
- তাকে সদকা হিসেবে টাকা দেওয়া
❌ যা করা যাবে না: ঋণ* হিসেবে দেওয়া (কারণ সুদি টাকা ঋণ দেওয়া যায় না)
- ধনী বা সচ্ছল ব্যক্তিকে দেওয়া
- নিজের ভোগ-ব্যবহারে আনা
৫. উত্তম পন্থা
সুদি টাকা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা:
- আসল টাকা (principal) ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া — এটাই আপনার হালাল সম্পদ।
- সুদি টাকা সরাসরি গরিব-মিসকিনকে সদকা করা — সওয়াবের নিয়ত ছাড়া, শুধু দায়মুক্তির নিয়তে।
- আপনার ভাগনের আর্থিক সমস্যা সমাধানে নিজের হালাল টাকা থেকে ঋণ বা সাহায্য করা — এতে সওয়াবও পাবেন।
সতর্কতা
- সুদি টাকা দিয়ে কাউকে সাহায্য করলে সে যদি ধনী হয়, তাহলে তা ফেরত নেওয়া ওয়াজিব।
- সুদি টাকায় সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না; এটি শুধু গুনাহ থেকে বাঁচার الوسيلة।
উপসংহার
আপনার ভাগনে যদি প্রকৃত গরিব হয়, তাহলে তাকে সদকা হিসেবে সুদি টাকা দেওয়া যাবে ।
রেফারেন্স:
- সূরা বাকারা: ২৭৫-২৭৮
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুর রিবা
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩
- বাহিশতী জেওর, সুদের অধ্যায়
والله أعلم بالصواب