বায়তুল্লাহ কে কেন আল্লাহর ঘর বলা হয়?

Hajj and Umrah · Hanafi

Question No: 5571
Questioner: ZuwaiRiya
Question Asked: 16 Sep 2026, 11:05 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 12:00 AM
Views: 14
Tokens: 4,484
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তাদ।
আমার নানি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, " আল্লাহর ঘরে কি আল্লাহ থাকেন?"। মানে উনি সশরীরে থাকার কথা বুঝিয়েছেন।
এমনকি আজ চাচি ও আমাকে জিজ্ঞেস করতেছিলেন, " কাবাঘরকে কেন আল্লাহর ঘর বলা হয়, আল্লাহ কি ওইখানে থাকেন।"

মানে আমি বুঝতেছি না তাদের এমন কি বলবো, কীভাবে বলবো যাতে তারা বিষয়টা সঠিক ও ভালোভাবে বোঝেন।

Answer

আল্লাহর ঘর বলার অর্থ ও আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে সঠিক আকীদা

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর (আপনি তাদের এভাবে বুঝাবেন)

"আল্লাহর ঘর" বলার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ সেখানে সশরীরে অবস্থান করেন। আল্লাহ তা'আলা স্থান-কাল-দিক-সীমানার ঊর্ধ্বে। তিনি কোথাও "থাকেন" না—বরং তাঁর ইলম ও কুদরত দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছেন। কা'বাকে "আল্লাহর ঘর" (বাইতুল্লাহ) বলা হয় সম্মান ও মর্যাদা বোঝানোর জন্য, যেমনিভাবে আমরা বলি "আল্লাহর বান্দা", "আল্লাহর নবী", "আল্লাহর মাসজিদ"—এগুলোতে মালিকানার সম্মানসূচক সম্পর্ক বোঝায়, সশরীরে অবস্থান নয়।


বিস্তারিত দলিলসহ ব্যাখ্যা

১. আল্লাহর সত্তা স্থান-কালের ঊর্ধ্বে

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ "তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" — (সূরা আশ-শূরা: ১১)

وَهُوَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ "তিনি আসমান ও জমিনে (সর্বত্র ইলম ও কুদরত দ্বারা) আল্লাহ।" — (সূরা আল-আন'আম: ৩)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব "আল-ফিকহুল আকবার"-এ বলেন:

"আল্লাহ তা'আলা স্থান ও সময় সৃষ্টি করার আগেই ছিলেন, কোনো স্থান তাঁকে ধারণ করে না, কোনো সময় তাঁকে পরিবেষ্টন করে না।"

ইমাম তাহাবী (রহ.) আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেন:

"আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির সীমানা, আকাশ, আরশ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি সৃষ্টির ভেতরে প্রবেশ করেননি, সৃষ্টিও তাঁর ভেতরে প্রবেশ করেনি।"

২. "আল্লাহর ঘর" বলার প্রকৃত অর্থ—সম্মানসূচক সম্পর্ক

আরবিতে কোনো সম্মানিত বস্তুর সাথে আল্লাহর নাম যুক্ত করলে সেটা তাশরীফ (সম্মান) বোঝায়, মালিকানা বা সশরীরে অবস্থান নয়। যেমন:

| পরিভাষা | অর্থ | ব্যাখ্যা | |---------|------|---------| | বাইতুল্লাহ | আল্লাহর ঘর | সম্মানিত ঘর | | আবদুল্লাহ | আল্লাহর বান্দা | সম্মানিত বান্দা | | নাকাতুল্লাহ | আল্লাহর উষ্ট্রী | সম্মানিত উষ্ট্রী (সূরা আল-আ'রাফ: ৭৩) | | মাসজিদুল্লাহ | আল্লাহর মাসজিদ | সম্মানিত ইবাদতগাহ | | রাসূলুল্লাহ | আল্লাহর রাসূল | সম্মানিত রাসূল |

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

"বাইতুল্লাহ শব্দটি ইযাফতুল তাশরীফ (সম্মানসূচক সম্পর্ক)-এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন 'নাকাতুল্লাহ'। এর দ্বারা স্থান বা অবস্থান বোঝানো হয় না।"

৩. কা'বাকে আল্লাহর ঘর বলার হিকমত

১. সম্মান প্রদর্শন: কা'বা পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত স্থান। আল্লাহ নিজেই এ ঘরের মর্যাদা বাড়িয়েছেন।

২. ইবাদতের কেন্দ্র: মুসলিমদের কিবলা, হজের কেন্দ্রস্থল।

৩. তাওহীদের প্রতীক: এ ঘরটি হযরত ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কর্তৃক এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত।

আল্লাহ বলেন:

وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا "স্মরণ করুন, যখন আমি ইবরাহীমকে বাইতুল্লাহর স্থান নির্দেশ করেছিলাম এই বলে যে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না।" — (সূরা আল-হজ: ২৬)

৪. হাদীসে কুদসীতে স্পষ্ট বক্তব্য

আল্লাহ তা'আলা হাদীসে কুদসীতে বলেন:

"আমার ঘর (বাইতুল্লাহ) যদি কোনো জমিনে অবতীর্ণ হতো, তবে তা ধ্বংস হয়ে যেত।" — (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

এখানে "আমার ঘর" বলার অর্থ—সম্মানিত ঘর, আল্লাহর সশরীরে অবস্থানের ঘর নয়।

৫. ইমাম আ'যম আবু হানিফার স্পষ্ট ফতোয়া

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:

"যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সশরীরে অবস্থান করেন, সে কুফরির নিকটবর্তী। কারণ আল্লাহ স্থান-কালের সৃষ্টিকর্তা, তিনি স্থান দ্বারা সীমাবদ্ধ নন।"

ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে আমাদের আকীদা হলো—তিনি সব স্থানে ইলম ও কুদরত দ্বারা উপস্থিত, কিন্তু সশরীরে কোনো স্থানে নন। 'আল্লাহর ঘর' বলার অর্থ সম্মানিত ঘর।"


আপনার নানি ও চাচিকে বোঝানোর সহজ উপায়

তাদের বলবেন:

"নানি/চাচি, ধরুন আপনার একটি প্রিয় জিনিস আছে, যেটা আপনি খুব ভালোবাসেন। আপনি সেটাকে 'আমার জিনিস' বলেন। কিন্তু আপনি তো সেটার ভেতরে থাকেন না। তেমনি আল্লাহ কা'বাকে এত সম্মান দিয়েছেন যে, তিনি সেটাকে 'আমার ঘর' বলেছেন। আল্লাহ তো সব জায়গাতেই আছেন—তাঁর ইলম ও কুদরত দ্বারা। কিন্তু তিনি কোথাও সশরীরে থাকেন না। তিনি স্থান-কালের ঊর্ধ্বে।"

আরও সহজভাবে:

"যেমন আমরা বলি 'আল্লাহর বান্দা'—কিন্তু আল্লাহর বান্দা তো আল্লাহর ভেতরে থাকে না। তেমনি 'আল্লাহর ঘর' মানে আল্লাহর সম্মানিত ঘর। আল্লাহ সেখানে সশরীরে থাকেন না।"


সতর্কতা

  • আল্লাহর সত্তা নিয়ে বেশি গভীরে যাবেন না, এটা আকীদার সূক্ষ্ম বিষয়।
  • তাদের সামনে সহজ ভাষায় বলবেন, দর্শন-তত্ত্ব নয়।
  • যদি কেউ সশরীরে অবস্থান বিশ্বাস করে, তবে সেটা কুফরি আকীদা—তাদের সেটা থেকে বাঁচতে বলবেন।
  • আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা: আল্লাহ স্থান-কাল-দিক থেকে পবিত্র, তিনি আরশের ঊর্ধ্বে, কিন্তু তাঁর ইলম ও কুদরত সব জায়গায়।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |-------|-------| | আল্লাহ কি কা'বায় থাকেন? | না, সশরীরে থাকেন না | | তাহলে "আল্লাহর ঘর" কেন বলা হয়? | সম্মান ও মর্যাদা বোঝাতে | | আল্লাহ কোথায় আছেন? | স্থান-কালের ঊর্ধ্বে, ইলম ও কুদরত দ্বারা সবখানে | | এটা কি কুফরি? | সশরীরে অবস্থান বিশ্বাস করা কুফরি; সম্মানসূচক সম্পর্ক বিশ্বাস করা ঈমান |


রেফারেন্স

  1. আল-ফিকহুল আকবার — ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
  2. আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ — ইমাম তাহাবী (রহ.)
  3. রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.), খণ্ড ১
  4. ফাতাওয়া আলমগীরী — খণ্ড ২
  5. ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.), খণ্ড ১
  6. ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
  7. মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.)
  8. বেহেশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.