শাশুড়ি কি মেয়েকে সম্পত্তি দিতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার শ্বশুর বেঁচে থাকার সময় রাস্তার পূর্ব পাশের ৩ শতক বসতভিটাটি তাঁর ছোট মেয়েকে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত সারমর্ম
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ:
- শাশুড়ি কি তার ছোট মেয়েকে (আপনার স্ত্রীকে) হেবা করে সম্পত্তি দিতে পারবেন?
- এতে মৃত ছেলের এক বছরের শিশু (নাতনি) কোনো হক থেকে বঞ্চিত হবে কি?
- গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি ছেড়ে দিলে কারো হক নষ্ট হবে কি?
বিস্তারিত উত্তর
১. হেবা (দান) করার বিধান
ইসলামী শরীয়তে হেবা একটি বৈধ চুক্তি। তবে হেবার কিছু শর্ত রয়েছে:
- হেবাকারীকে সম্পত্তির প্রকৃত মালিক হতে হবে। আপনার শাশুড়ি যদি আড়াই শতক জমির প্রকৃত মালিক হন, তাহলে তিনি তা হেবা করতে পারবেন।
- হেবা হতে হবে স্বেচ্ছায়, কোনো চাপ বা ভয় ছাড়া।
- হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য দখল হস্তান্তর (কবজা) জরুরি। শুধু কাগজে লিখে দিলেই হেবা সম্পন্ন হয় না; বরং হেবাকৃত সম্পত্তির দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: "হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য কবজা (দখল) শর্ত।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হিবা)
২. শাশুড়ি কি তার মেয়েকে হেবা করতে পারবেন?
হ্যাঁ, পারবেন — যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- আড়াই শতক জমিটি আপনার শাশুড়ির নিজস্ব মালিকানাধীন হতে হবে (অর্থাৎ আপনার শ্বশুর তাকে বৈধভাবে হেবা বা বিক্রয় করেছেন এবং দখল হস্তান্তর হয়েছে)।
- রাস্তার পূর্ব পাশের তিন শতক জমিটিও যদি তার মালিকানায় থাকে, তাহলে তিনি তা দুই মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারবেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি আপনার শ্বশুর মারা যাওয়ার পর উক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে সবার মধ্যে বণ্টন না হয়ে শুধু শাশুড়ির নামে লিখা থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তা সব ওয়ারিশের মধ্যে শরীয়তসম্মতভাবে বণ্টন হওয়া আবশ্যক। সেক্ষেত্রে শাশুড়ি একা পুরো সম্পত্তির মালিক নন; তিনি শুধু তার নির্ধারিত অংশের মালিক।
৩. মৃত ছেলের সন্তানের হক
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনার শ্বশুরের মৃত্যুর সময় তার ছেলে (আপনার সম্মন্দি) জীবিত ছিলেন কি না — এটা নির্ধারক।
-
যদি শ্বশুরের মৃত্যুর সময় ছেলেটি জীবিত ছিলেন: তাহলে ছেলেটি তার পিতার সম্পত্তির ওয়ারিশ হিসেবে অংশ পেয়েছেন। ছেলেটির মৃত্যুর পর তার অংশ তার নিজের সন্তানদের (এক বছরের শিশুসহ) মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টিত হবে। সেক্ষেত্রে শিশুটির হক রয়েছে।
-
যদি ছেলেটি শ্বশুরের মৃত্যুর আগেই মারা যান: তাহলে তিনি দাদার সম্পত্তির ওয়ারিশ নন, এবং তার সন্তানও দাদার সম্পত্তিতে সরাসরি ওয়ারিশ নয় (তবে হানাফি মাযহাবে দাদার সম্পত্তিতে নাতির হক সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে)।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, শ্বশুর জীবিত থাকাকালীন ছেলেকে আড়াই শতক লিখে দিয়েছেন এবং বড় মেয়েকে তিন শতক লিখে দিয়েছেন। এগুলো যদি হেবা হিসেবে বৈধভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে (দখল হস্তান্তরসহ), তাহলে সেই সম্পত্তি ওই ব্যক্তিদের মালিকানায় চলে গেছে এবং তা আর শ্বশুরের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না।
৪. নাতনির হক থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়
যদি আপনার শাশুড়ি তার নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি তার মেয়েকে হেবা করেন, তাহলে তাতে নাতনির কোনো হক নষ্ট হবে না — কারণ নাতনির হক শুধু তার পিতার সম্পত্তিতে, দাদি/নানির সম্পত্তিতে নয় (যদি না দাদি/নানির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হয়)।
তবে সতর্কতা: আপনার শাশুড়ি যদি মৃত্যুশয্যায় (মারদুল মাউত) থাকেন, তাহলে তার হেবা বা দান সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত বৈধ হবে; এর বেশি হলে ওয়ারিশদের অনুমতি ছাড়া কার্যকর হবে না।
রাদ্দুল মুহতার-এ আছে: "মারদুল মাউত অবস্থায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত বা দান নাফেজ হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ওসিয়া)
৫. গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়
গ্রামের বাড়িতে ১২ শতক জমি ও ৭ শতক বসতভিটা যদি আপনার শ্বশুরের নামে থাকে এবং তা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য হয়, তাহলে:
- প্রত্যেক ওয়ারিশের শরীয়তসম্মত অংশ নির্ধারিত আছে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় তার অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা তার নিজের ইচ্ছা — এতে অন্য কারো হক নষ্ট হয় না।
- তবে মৃত ছেলের সন্তানের (নাতনির) পক্ষ থেকে কেউ তার হক ছেড়ে দিতে পারবে না, যদি না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং নিজে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেয়। নাবালেগের সম্পত্তি অভিভাবকও ছেড়ে দিতে পারবেন না।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে: "নাবালেগের সম্পত্তি তার অভিভাবকও হস্তান্তর বা দান করতে পারবে না।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, কিতাবুল হিবা)
৬. আপনার শ্বশুরের ইচ্ছা প্রকাশ
আপনার শ্বশুর জীবিত থাকাকালীন রাস্তার পূর্ব পাশের ৩ শতক বসতভিটা ছোট মেয়েকে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করলে তা কার্যকর হয় না — শরীয়তসম্মত হেবা সম্পন্ন হতে হলে দখল হস্তান্তরসহ পূর্ণ হেবা করতে হবে। যদি শ্বশুর জীবিত থাকাকালীন তা কার্যকরভাবে হেবা না করে থাকেন, তাহলে তা তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সব ওয়ারিশের মধ্যে শরীয়তসম্মতভাবে বণ্টন হবে।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | শাশুড়ি নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি মেয়েকে হেবা করতে পারবেন? | হ্যাঁ, শর্তসাপেক্ষে | | নাতনির হক নষ্ট হবে? | না, যদি সম্পত্তি শাশুড়ির নিজের হয় | | মারদুল মাউত অবস্থায় হেবা? | সর্বোচ্চ ১/৩ | | গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া? | নিজের অংশ ছেড়ে দেওয়া বৈধ; নাবালেগের পক্ষ থেকে নয় | | শ্বশুরের ইচ্ছা প্রকাশ | শুধু ইচ্ছায় হেবা সম্পন্ন হয় না |