লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াসে বসবাসকারী স্বামী-স্ত্রীর জন্য উতেনায় নামাজ কসর না পূর্ণ করতে হবে?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই ইউরোপের লিথুয়ানিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছি। আমরা লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে থাকি। আমাদের ভার্সিটি অন্য একটি শহর উতেনায়, যা ভিলনিয়াস থেকে প্রায় ৯০–১০০ কিলোমিটার দূরে।
আমাদের ভার্সিটিতে হোস্টেলের ব্যবস্থা আছে এবং সেখানে আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী একই রুমে থাকি। প্রতি সপ্তাহে আমাদের ভার্সিটির জন্য উতেনায় যেতে হয় এবং সেখানে ২ দিন থাকতে হয়।
এই অবস্থায় শরিয়াহ অনুযায়ী আমাদের নামাজ কি কসর পড়তে হবে, নাকি পূর্ণ নামাজ পড়তে হবে?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনাদের ক্ষেত্রে নামাজ কসর পড়তে হবে, অর্থাৎ প্রত্যেক ৪ রাকআত ফরজ নামাজ ২ রাকআত পড়তে হবে। কারণ, উতেনা শহরটি আপনার ইকামত স্থল বা আবাসস্থল (ভিলনিয়াস) থেকে ৯০–১০০ কিমি দূরে এবং সেখানে গমন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সফর হিসেবে গণ্য হয়। হোস্টেলে স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকা বা ২ দিন অবস্থান করা সফরের হুকুম বদলায় না, যতক্ষণ না আপনি সেখানে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করেন।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা
১. সফরের দূরত্ব (মুসাফির হওয়ার শর্ত)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মুসাফির হয় যদি সে তিন দিনের পথ (প্রায় ৭৭–৭৮ কিমি বা তার বেশি) চলার দূরত্বে যায়।
- আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
“সফরের সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো তিন দিনের পথ, যা প্রায় ৭৭ কিমি।”
(রাদ্দুল মুহতার, ২/১২১; আল-হিদায়া, ১/৮০)
আপনাদের ক্ষেত্রে ভিলনিয়াস থেকে উতেনা প্রায় ৯০–১০০ কিমি, যা স্পষ্টভাবে সফরের দূরত্বের মধ্যে পড়ে।
২. সফরে কসর করার হুকুম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“তোমরা যখন জমিনে সফর করো, তখন তোমাদের জন্য নামাজ কসর করা কোনো দোষ নেই।”
(সূরা আন-নিসা: ১০১)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সদকা, তাই তোমরা তাঁর সদকা কবুল করো।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৬)
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়া-তে বলা হয়েছে:
“মুসাফিরের জন্য ৪ রাকআত ফরজ নামাজ ২ রাকআত পড়া ওয়াজিব।”
(আল-হিদায়া, ১/৮০)
৩. সফরে অবস্থানের সময়সীমা (১৫ দিনের নিয়ম)
হানাফি মাজহাবে মুসাফির যদি কোনো স্থানে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করে, তবে সে মুকিম হয়ে যায় এবং পূর্ণ নামাজ পড়বে। আর যদি ১৫ দিনের কম থাকে, তবে সে মুসাফিরই থাকে।
- রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামি রহ. বলেন:
“যদি মুসাফির কোনো স্থানে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে, সে মুকিম হয়ে যায়; অন্যথায় মুসাফির থাকে।”
(রাদ্দুল মুহতার, ২/১২৭)
আপনারা উতেনায় প্রতি সপ্তাহে মাত্র ২ দিন থাকেন, তাই ১৫ দিনের নিয়ত নেই। ফলে সেখানে থাকাকালীন আপনি মুসাফিরই থাকবেন এবং কসর পড়বেন।
৪. হোস্টেলে স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকা
হোস্টেলে স্বামী-স্ত্রী একই রুমে থাকা সফরের হুকুমকে প্রভাবিত করে না। কারণ, সফরের হুকুম নির্ভর করে দূরত্ব ও অবস্থানের সময়সীমার উপর, আবাসনের ধরনের উপর নয়।
- ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
“মুসাফিরের জন্য আবাসস্থল বা হোটেল পরিবর্তন হলে কসরের হুকুম পরিবর্তন হয় না, যতক্ষণ না সে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে।”
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৯৮)
৫. সাপ্তাহিক যাতায়াত
যেহেতু আপনি প্রতি সপ্তাহে ভিলনিয়াস থেকে উতেনায় যান এবং ২ দিন থাকেন, তাই:
- ভিলনিয়াসে থাকাকালীন: আপনি মুকিম, পূর্ণ নামাজ পড়বেন।
- উতেনায় পৌঁছে: সফরের দূরত্ব অতিক্রম করার কারণে আপনি মুসাফির হয়ে যাবেন, কসর পড়বেন।
- উতেনা থেকে ফিরে ভিলনিয়াসে আসার পর: আবার মুকিম, পূর্ণ নামাজ পড়বেন।
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ:
যদি আপনি উতেনায় পৌঁছে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করেন, তবে সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বেন। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে মাত্র ২ দিন থাকেন, তাই কসরই পড়বেন।
সারসংক্ষেপ
| অবস্থান | হুকুম | নামাজ | |----------|--------|--------| | ভিলনিয়াস (অস্থায়ী আবাস বা ইকামত স্থল) | মুকিম | পূর্ণ ৪ রাকআত | যদি কখনো ১৫ দিন অবস্থান করে নেন, তাহলে এই জায়গা আপনাদের জন্য ইকামত স্থল হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানে আপনারা পূর্ণ নামায পড়বেন। | উতেনা (সফরস্থল, ২ দিন) | মুসাফির | কসর ২ রাকআত | | ভিলনিয়াসে ফিরে আসা | মুকিম | পূর্ণ ৪ রাকআত |
উপদেশ:
সফরে কসর করা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ণ নামাজ পড়া মাকরুহ তাহরিমি। তবে যদি কেউ ভুলে পূর্ণ পড়ে ফেলে, তবে সিজদা সাহু দিতে হবে না, তবে তা পুনরায় কসর পড়া উত্তম নয়; বরং ভবিষ্যতে কসর আদায় করবেন।
والله أعلم بالصواب
ফাতাওয়া বিভাগ
দারুল ইফতা, হানাফি মাজহাব