এহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ছাড়া সাবান বা সেম্পু ব্যবহার করা যাবে কি না?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
Answer
এহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ছাড়া সাবান বা সেম্পু ব্যবহার করার বিধান
প্রশ্নের উত্তর
এহরাম অবস্থায় সুগন্ধিবিহীন (আউ ডি পারফিউম বা ফ্র্যাগরেন্স ফ্রি) সাবান বা সেম্পু ব্যবহার করা জায়েজ (অনুমোদিত) এবং এতে কোনো গোনাহ নেই। তবে সুগন্ধিযুক্ত বা পারফিউমযুক্ত সাবান-সেম্পু ব্যবহার করা নিষিদ্ধ (হারাম বা মাকরুহে তাহরিমি)।
দলিল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এহরাম অবস্থায় শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি (আতর, পারফিউম, খুশবু) লাগানো হারাম। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যেমন—
➤ হাদিসে এসেছে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “এহরামধারী ব্যক্তি যেন সুগন্ধি ব্যবহার না করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৭৭)
➤ হানাফি ফিকহের প্রধান কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’ (৩/৫০৪)-এ উল্লেখ আছে: “এহরামধারীর জন্য সুগন্ধি মাখা, সুগন্ধিযুক্ত তেল ব্যবহার করা, এমনকি সুগন্ধিযুক্ত কাপড় পরিধান করাও নিষিদ্ধ।”
এখন প্রশ্ন হলো, সাবান বা সেম্পু কি এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত?
সুগন্ধি ছাড়া সাবান/সেম্পু (Unscented Soap/Shampoo)
সাবান বা সেম্পু সাধারণত পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যদি এতে কোনো কৃত্রিম সুগন্ধি (পারফিউম) না থাকে, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ। কারণ এটি সুগন্ধি লাগানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং পরিচ্ছন্নতার জন্য। হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো— “নিষেধাজ্ঞা শুধু সেই জিনিসের জন্য, যা সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করার ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য থাকে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪০৮; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫)
➤ ‘বেহেশতি জেওর’ (হজ অধ্যায়)-এ লেখা আছে: “এহরাম অবস্থায় গোসল করার জন্য সুগন্ধিবিহীন সাবান ব্যবহার করা জায়েজ। তবে সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করবে না।”
➤ ‘ফাতাওয়া আলমগিরি’ (১/২৪০)-তে বলা হয়েছে: “এহরামধারী ব্যক্তি যদি সুগন্ধি ছাড়া সাবান বা মাটি দিয়ে শরীর পরিষ্কার করে, তবে তা জায়েজ।”
সুগন্ধিযুক্ত সাবান/সেম্পু (Scented Soap/Shampoo)
যদি সাবান বা সেম্পুতে সুগন্ধি (যেমন— ল্যাভেন্ডার, গোলাপ, জুঁই ইত্যাদির কৃত্রিম পারফিউম) থাকে, তবে তা ব্যবহার করা হারাম বা মাকরুহে তাহরিমি। কারণ এটি সুগন্ধি প্রয়োগের শামিল। এমনকি যদি গোসলের পরও সুগন্ধ শরীরে লেগে থাকে, তবুও তা নিষিদ্ধ।
➤ শায়খুল হিন্দ মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেছেন: “এহরাম অবস্থায় সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করা মাকরুহ, কারণ এটি সুগন্ধি লাগানোর বিকল্প হিসেবে গণ্য হয়।” (ফয়যুল বারী, ৪/২৪৮)
ব্যতিক্রম: প্রাকৃতিক গন্ধ (Natural Smell)
যদি সাবান বা সেম্পুতে কোনো কৃত্রিম পারফিউম না থাকে, কিন্তু এর উপকরণের কারণে প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা গন্ধ থাকে (যেমন— অলিভ অয়েল সাবানের হালকা গন্ধ), তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ। কারণ এটি ‘সুগন্ধি’ বলেই গণ্য হয় না। তবে সতর্কতা হিসেবে সম্পূর্ণ গন্ধহীন (Unscented) পণ্য ব্যবহার করাই উত্তম।
সারসংক্ষেপ
| অবস্থা | সাবান/সেম্পু | বিধান | |--------|--------------|-------| | সুগন্ধি ছাড়া (Unscented) | ব্যবহার জায়েজ | ✅ | | সুগন্ধিযুক্ত (Scented) | ব্যবহার নিষিদ্ধ | ❌ | | প্রাকৃতিক গন্ধ (Natural) | ব্যবহার জায়েজ, তবে উত্তম হলো গন্ধহীন | ✅(উত্তম) |
গুরুত্বপূর্ণ নোট
- গোসল ও অজুর সময় এহরামধারী ব্যক্তি সুগন্ধিবিহীন সাবান ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করলে তার ওপর দম (কুরবানি) ওয়াজিব হতে পারে।
- সুগন্ধিযুক্ত টিস্যু, টাওয়েল বা অন্য কোনো জিনিস ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ।
- মাথার ত্বক, দাড়ি, গোফ— এই সব স্থানেও সুগন্ধি সেম্পু বা সাবান ব্যবহার করা যাবে না।
- মেডিকেল প্রয়োজন থাকলে (যেমন— চিকিৎসকের নির্দেশে), সেক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে সুগন্ধিবিহীন সাবান ব্যবহার করা যায়। তবে সুগন্ধিযুক্ত হলে বিকল্প খুঁজতে হবে।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিল
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): এহরামের সুগন্ধি সংক্রান্ত অধ্যায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে— "সুগন্ধি ছাড়া সাবান জায়েজ।"
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): “এহরামে সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করা নাজায়েজ। তবে সাধারণ সাবান ব্যবহার করাতে কোনো অসুবিধা নেই।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): “সুগন্ধিহীন সাবান দিয়ে গোসল করা জায়েজ।”
- বেহেশতি জেওর (হজ অধ্যায়): “সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করবে না।”
- শরহু মা’আনিল আসার (ইমাম তাহাবী): এহরামের বিধান প্রসঙ্গে উল্লেখ আছে— “যা কিছু সুগন্ধি হিসেবে গণ্য হয়, তা নিষিদ্ধ; অন্যান্য জিনিস জায়েজ।”
শেষ কথা
এহরাম অবস্থায় সুগন্ধিবিহীন সাবান বা সেম্পু ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। বাজারে গন্ধহীন (Fragrance-Free) সাবান ও সেম্পু পাওয়া যায়, সেগুলো নিরাপদ। সুগন্ধিযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলাই কর্তব্য। কোনো সন্দেহ থাকলে নিকটস্থ আলেম বা মুফতির কাছে জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো।
আল্লাহ তাআলা আমাদের হজ ও উমরা সহজ করে দিন এবং কবুল করুন। (আমিন)