জীবিত ব্যক্তির আমল দ্বারা মৃত ব্যক্তি কি সওয়াব পাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উল্লেখ কারণ বিশ্লেষণ করলে তো সওয়াব পাওয়ার কথা না। তাহলে আসলে কোনটা হবে?
Answer
মৃত্যু ব্যক্তি দ্বারা হেদায়েত - ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তা-উদ্দীপক। আসুন আমরা কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
মূলনীতি: নিয়তের গুরুত্ব
আপনি সঠিকই বলেছেন যে, আমলের সওয়াব নিয়তের উপর নির্ভরশীল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى" "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তা-ই পাবে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
মৃত ব্যক্তির সওয়াব পাওয়ার বিষয়ে ইসলামী বিধান
১. মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো আমলসমূহ
মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু আমলের সওয়াব পৌঁছায়। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ" "যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ছাড়া: চলমান সদকা, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, অথবা সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
২. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ইসালে সওয়াব
হানাফী মাযহাবের বিশ্বস্ত উৎসসমূহে উল্লেখ আছে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো (ইসালে সওয়াব) বৈধ এবং এর দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)《রাদ্দুল মুহতার》
"يَصِلُ ثَوَابُ الْقِرَاءَةِ إِلَى الْمَيِّتِ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ" "আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৪২)
৩. মৃত ব্যক্তির কারণে অন্যদের হেদায়েত পাওয়া
এখন আপনার মূল প্রশ্নে আসা যাক। যদি কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে তার পরিবারের সদস্যরা নামাজ পড়া, রোযা রাখা শুরু করে, তাহলে মৃত ব্যক্তি কি সওয়াব পাবে?
ক. পরোক্ষ কারণ হওয়ার সওয়াব
যদিও মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুকে "হেদায়েতের কারণ" হিসেবে নিয়ত করেনি, তবুও ইসলামী দৃষ্টিতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যায়:
প্রথমত: যদি মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় পরিবারকে নামাজ-রোযার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে থাকেন, অথবা তার ভালো চরিত্র ও আমলের কারণে পরিবার অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে, তাহলে হাদীস অনুযায়ী সে সওয়াব পাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ" "যে ব্যক্তি ভালো কাজের পথ দেখায়, সে ঐ কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পায়।" (সহীহ মুসলিম: ১৮৯৩)
দ্বিতীয়ত: যদি মৃত ব্যক্তি এমন কোনো শিক্ষা বা উদাহরণ রেখে গেছেন যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে, তাহলে তা "সদকায়ে জারিয়া" বা "ইলমে নাফে" হিসেবে গণ্য হবে।
খ. মৃত ব্যক্তির নিয়ত না থাকলেও সওয়াব পাওয়ার সম্ভাবনা
আপনি প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন যে, মৃত ব্যক্তি তো "আমার মৃত্যু যেন কারো হেদায়েতের কারণ হয়" নিয়ত করেনি। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে আল্লাহর রহমত অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ" "আর আল্লাহ মহান অনুগ্রহের মালিক।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১০৫)
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার তাফসীর "মা'আরিফুল কুরআন"-এ উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দার ভালো কাজের প্রতিদান দেন এবং কখনো কখনো এমন পরিস্থিতিতেও সওয়াব দেন যা বান্দা নিজে কল্পনাও করেনি।
গ. পরিবারের সদস্যদের আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দেওয়া
পরিবারের সদস্যরা যদি চান, তারা নিজেদের আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে হাদিয়া (উপহার) হিসেবে পাঠাতে পারেন। এটি হানাফী মাযহাবে বৈধ এবং এর দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়।
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)
"মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তার পক্ষ থেকে সদকা করা এবং কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো - এই সবগুলোই বৈধ এবং এর দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়।"
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো:
১. মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুর কারণে পরিবারের সদস্যদের নামাজ-রোযা শুরু করার সরাসরি সওয়াব পাবে না, যদি না সে জীবদ্দশায় তাদেরকে এর জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকে বা ভালো উদাহরণ স্থাপন করে থাকে।
২. তবে, যদি মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় সৎকর্মশীল ছিলেন এবং তার ভালো চরিত্র ও আমল পরিবারের সদস্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে, তাহলে হাদীসের ভিত্তিতে সে সওয়াব পেতে পারে।
৩. পরিবারের সদস্যরা চাইলে নিজেদের আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে হাদিয়া হিসেবে পাঠাতে পারেন, যা হানাফী মাযহাবে বৈধ।
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"دَعْوَةُ الْمُسْلِمِ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ مُسْتَجَابَةٌ" "মুসলিমের তার ভাইয়ের জন্য গায়েবানা দোয়া কবুল হয়।" (সহীহ মুসলিম: ২৭৩৩)
উপসংহার
মৃত ব্যক্তি যদি জীবদ্দশায় পরিবারের সদস্যদেরকে নামাজ-রোযার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তার মৃত্যুর পর তারা নামাজ-রোযা শুরু করলে তিনি সওয়াব পাবেন। কিন্তু যদি তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং তার মৃত্যুই শুধু কারণ হয়, তাহলে সরাসরি সওয়াব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে আল্লাহর রহমত অপরিসীম এবং তিনি যাকে ইচ্ছা বেশি দান করেন।
পরিবারের সদস্যদের উচিত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং তার পক্ষ থেকে সদকা করা, ইনশাআল্লাহ এতে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে।
"رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا" "হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা আল-ইসরা: ২৪)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই সর্বোত্তম জ্ঞানী।