জিকির গণনা করা, এউকু তে হাত রাখা বা লাগা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১। আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার তার রাহে বেলায়াত গ্রন্থে লিখেছেন, সাহাবী বা তাবেয়ী গণ অধিক পরিমাণে জিকির করার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট অযীফা করতেন। যেমন পেতিদিন ১০০০ বার ইস্তেগফার
এর প্রমাণ কি সহিহ।
২। রুকু করার সময় বগলে যদি শরিরে পাজর না লাগাকি সুন্নাহ?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্ন দুটির উত্তর নিম্নরূপ:
প্রশ্ন ১: সাহাবী বা তাবেয়ীগণ কি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক (যেমন ১০০০ বার) ইস্তেগফার বা যিকির করতেন?
উত্তর: হ্যাঁ, এ কথা সঠিক যে, সাহাবী ও তাবেয়ীগণ যিকির ও ইস্তেগফারের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক যিকিরের অভ্যাস রাখতেন। তবে "প্রতিদিন ১০০০ বার ইস্তেগফার" এর ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সহিহ হাদিস বা ছহিহ আছার (সাহাবীদের বাণী) আমার জানামতে নেই। তবে এ ধরনের আমলের ভিত্তি রয়েছে।
দলিল ও প্রমাণ:
১. কুরআনুল কারিমে ইস্তেগফারের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।" (সূরা নূহ: ১০)। এছাড়া বহু আয়াতে ইস্তেগফারের নির্দেশ ও গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে।
২. হাদিসে ইস্তেগফারের ফজিলত: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে দৈনিক ৭০ বার বা ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন। হাদিসে এসেছে, "আমি দৈনিক সত্তর বারের বেশি ইস্তেগফার করি।" (সহিহ বুখারি)। অন্য হাদিসে আছে, "আল্লাহর কসম! আমি দৈনিক সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করি এবং তওবা করি।" (সহিহ বুখারি)।
৩. সাহাবীদের আমল: সাহাবীগণ যিকিরের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রতিদিন ১২,০০০ বার যিকির করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব)। তাবেয়ীগণের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রহ.) সহ অনেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক যিকিরের অভ্যাস রাখতেন।
৪. ফিকহের কিতাবে উল্লেখ: হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে বর্ণিত আছে যে, যিকিরের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা এবং তা নিয়মিত পালন করা মুস্তাহাব। তবে এ সংখ্যা কুরআন-হাদিস থেকে প্রমাণিত হওয়া জরুরি নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা যেতে পারে।
মূলনীতি: ইসলামি স্কলারগণ বলেন, যিকিরের সংখ্যা নির্ধারণ করা জায়েয, যদি তা শরিয়তের পরিপন্থী না হয়। তবে সংখ্যা নির্ধারণকে আবশ্যক মনে করা বা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মুফতি তাকি উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) সহ আধুনিক হানাফি আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, নির্দিষ্ট সংখ্যক যিকিরের অভ্যাস রাখা ভালো, তবে তা ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা যাবে না।
সারকথা: আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বক্তব্যের মূল কথা সঠিক যে, সাহাবী-তাবেয়ীগণ যিকিরের প্রতি যত্নবান ছিলেন এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক যিকির করতেন। তবে "প্রতিদিন ১০০০ বার ইস্তেগফার" এর নির্দিষ্ট সংখ্যাটি কোনো সহিহ হাদিস বা আছার দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং এটি একটি অভ্যাসগত আমল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
প্রশ্ন ২: রুকু করার সময় বগলে শরীরের পাজর (পাঁজর) না লাগানো কি সুন্নাহ?
উত্তর: জি হ্যাঁ, রুকুতে বগল ফাঁকা রাখা এবং পাঁজরের সাথে বাহু না মেলানো সুন্নাহ। এটি রুকুর একটি মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) আমল।
দলিল ও প্রমাণ:
১. হাদিস: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যেন রুকুতে নিজের বাহুকে (শরীরের সাথে) মেলিয়ে না দেয়, যেমন কুকুর তার হাত মেলিয়ে দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৬৭; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬০; সুনানে নাসায়ি)।
২. হানাফি ফিকহের কিতাব: আল-হিদায়া ও রদ্দুল মুহতার-এ বর্ণিত আছে যে, রুকুতে পুরুষের জন্য মুস্তাহাব হলো—পিঠ সোজা রাখা, মাথা পিঠের সমান রাখা এবং বাহুকে শরীর থেকে আলাদা রাখা (বগল ফাঁকা রাখা)। তবে মহিলাদের জন্য এ বিধান ভিন্ন; তারা শরীর গুটিয়ে রুকু করবেন।
৩. ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে: "রুকুতে পুরুষের জন্য মুস্তাহাব হলো, সে তার বাহুকে পাঁজর থেকে আলাদা রাখবে এবং বগল ফাঁকা রাখবে।"
সারকথা: রুকুতে বগল ফাঁকা রাখা এবং পাঁজরের সাথে বাহু না লাগানো সুন্নাহ-সম্মত আমল। এটি পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য। মহিলাদের জন্য বিধান হলো, তারা রুকুতে শরীর গুটিয়ে নেবেন এবং বাহু শরীরের সাথে মিলিয়ে রাখবেন, কারণ তাদের জন্য লুকানো ও সংকুচিত হওয়া উত্তম।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত প্রামাণ্য কিতাবসমূহ:
- আল-হিদায়া (মারগিনানি)
- রদ্দুল মুহতার আলাদ-দুররিল মুখতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি)
- সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে নাসায়ি
- সহিহ বুখারি