একজন মুসলমানের জীবন যাপন করার পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিৎ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
একজন মুসলমানের জীবন যাপন করার পদ্ধতি
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
ভূমিকা
ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)
একজন মুসলমানের জীবন যাপনের পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ সকল ইমামগণ এই বিষয়ে একমত যে, মুসলমানের জীবনাচরণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হতে হবে।
১. আকীদা ও বিশ্বাস সংশোধন
সর্বপ্রথম একজন মুসলমানের তাওহীদ (একত্ববাদ) ও সঠিক আকীদা থাকা আবশ্যক। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "আল-ফিকহুল আকবর"-এ তাওহীদ ও সঠিক আকীদার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের সিয়াম পালন করা এবং বায়তুল্লাহর হজ্জ সম্পাদন করা।" (সহীহ বুখারী: ৮; সহীহ মুসলিম: ১৬)
২. ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া
ক. নামায
নামায মুমিনের মিরাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "জেনে রেখো, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হলো নামায।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৭)
খ. যাকাত
সম্পদের পবিত্রতার জন্য যাকাত ফরয। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নামায কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১১০)
গ. সিয়াম
রমযানের সিয়াম তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৩)
ঘ. হজ্জ
সামর্থ্যবানদের উপর জীবনে একবার হজ্জ ফরয। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ ঘরের হজ্জ করা মানুষের উপর ফরয, যে ব্যক্তি এ পর্যন্ত পথের সামর্থ্য রাখে।" (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)
৩. চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমি উত্তম চরিত্র পূর্ণ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।" (মুয়াত্তা মালিক: ১৬১১)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "সৎ চরিত্র হলো, তুমি যা পছন্দ করো না, তা অন্যের জন্য পছন্দ করবে না।"
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।" (সহীহ বুখারী: ৬০৩৫)
৪. হালাল উপার্জন ও রিযিক
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) হালাল রিযিকের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"অতঃপর যখন নামায সমাপ্ত হয়, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর।" (সূরা আল-জুমুআহ: ১০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হালাল রিযিক সন্ধান করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।" (মু'জামুল আওসাত, তাবারানী: ৮৩১৮)
৫. সামাজিক সম্পর্ক ও আচরণ
ক. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
খ. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (সহীহ বুখারী: ৬১৩৮)
গ. প্রতিবেশীর অধিকার
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে, আমার মনে হয়েছে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৫; সহীহ মুসলিম: ২৬২৪)
৬. সময়ের সদ্ব্যবহার
ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন: "হে আদম সন্তান! তুমি তো কয়েকটি দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে যায়, তখন তোমার একটি অংশও চলে যায়।"
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "দুটি নেয়ামত রয়েছে, যার ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: সুস্থতা এবং অবসর সময়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪১২)
৭. দৈনন্দিন জীবনের আদবসমূহ
ক. খাওয়ার আদব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন ডান হাতে খায় এবং ডান হাতেই পান করে।" (সহীহ বুখারী: ৫৩৭৬)
খ. ঘুমানোর আদব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা যখন ঘুমানোর ইচ্ছা করো, তখন ডান কাতে শুয়ে অযু করো।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭)
গ. কথা বলার আদব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮; সহীহ মুসলিম: ৪৭)
৮. দ্বীনি ইলম অর্জন
ইলম অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "ইলম ছাড়া ইবাদত করা যায় না।"
৯. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "তাকওয়া হলো, আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর আনুগত্য করা।"
১০. দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দ্বারা আখিরাতের গৃহ অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না।" (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "দুনিয়া হলো আখিরাতের জন্য কৃষিক্ষেত্র।"
১১. ধৈর্য ও সহনশীলতা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আশ্চর্যের বিষয় মুমিনের ব্যাপার! নিশ্চয়ই তার সকল কাজই কল্যাণকর। যদি সে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে, তবে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি সে কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, যা তার জন্য কল্যাণকর।" (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯)
১২. ক্ষমা ও উদারতা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তারা ক্ষমা করে এবং মার্জনা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪০)
১৩. সততা ও আমানতদারিতা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "প্রতারণাকারী আমার উম্মতের নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০২)
১৪. পরামর্শ ও শূরা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তাদের কাজকর্ম পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে হয়।" (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)
১৫. ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবাহ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সকল আদম সন্তান পাপী, আর পাপীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারা, যারা তাওবাহ করে।" (সুনানে তিরমিযী: ২৪৯৯)
উপসংহার
একজন মুসলমানের জীবন যাপন পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "যখন কোনো হাদীস সহীহ হয়, তখন তা-ই আমার মাযহাব।"
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন: "মুসলমানের জীবন হলো ইবাদত, আখলাক ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়।"
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: "একজন মুসলমানের জীবনযাপন এমন হওয়া উচিত যেন তার প্রতিটি কাজ, কথা ও আচরণে ইসলামের প্রতিফলন দেখা যায়।"
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب