নামাজ ও তিলাওয়াতের পর পোশাকে নাপাকি পাওয়া গেলে কী করণীয়?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
উস্তাজ আমি আজকে কয়েক রাকাত নফল নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত করার পরে জানতে পারি যে আমার পায়জামা নাপাক ছিলো। মানে নাপাকি আগে থেকেই লেগে ছিলো। ওজু করার পরে না। তো এখন এগুলো সব কি আমার কাজা করতে হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—নামাজ ও তিলাওয়াতের পর জানতে পেরেছেন যে, আপনার পায়জামায় আগে থেকেই নাপাকি লেগে ছিল। এখন এই নামাজ ও তিলাওয়াতের কী হুকুম হবে?
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী:
১. নামাজের ক্ষেত্রে: যদি আপনি নামাজের সময় জানতেন না যে আপনার পোশাকে নাপাকি লেগেছে, এবং পরে জানতে পারেন, তাহলে আপনার সেই নামাজটি আদায় হয়ে গেছে এবং তা পুনরায় (কাজা) করতে হবে না।
কারণ, নাপাকি সম্পর্কে অজ্ঞতা বা ভুলে যাওয়া ‘উযর’ (ওজর/অজুহাত) হিসেবে গণ্য হয়। কুরআন ও হাদিসে অজ্ঞতাবশত ভুলের ক্ষেত্রে সওয়াব ও ক্ষমার ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا (সূরা বাকারা: ২৮৬) “হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ (ইবনে মাজাহ: ২০৪৫) “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
তবে শর্ত হলো—নাপাকির পরিমাণ যদি এক দিরহাম (প্রায় ৩.৩৭৫ বর্গ সেন্টিমিটার বা একটি সুইয়ের মাথার সমান) এর বেশি হয় এবং আপনি তা জানতেন না বা ভুলে গিয়েছিলেন, তাহলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু যদি নাপাকির পরিমাণ এক দিরহামের কম হয়, তাহলে তা মাফ এবং নামাজ শুদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৬১)
২. কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে: পোশাকে নাপাকি থাকা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হলেও, তিলাওয়াতটি আদায় হয়ে গেছে এবং তা পুনরায় করতে হবে না। তবে এর জন্য তওবা-ইস্তিগফার করা উচিত, কারণ নাপাক অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা অনুচিত। কিন্তু যেহেতু আপনি অজ্ঞাত ছিলেন, তাই গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ।
৩. ওজু ও নামাজের সম্পর্ক: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, নাপাকি ওজুর পরে লাগেনি, বরং আগে থেকেই ছিল। এটি আপনার অজান্তে ছিল। তাই আপনার ওজু ও নামাজ উভয়ই শুদ্ধ। ওজুতে পোশাকের পবিত্রতা শর্ত নয়, বরং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পবিত্র থাকাই ওজুর জন্য যথেষ্ট।
৪. গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা:
- যদি কেউ নামাজের মাঝখানে জানতে পারে যে তার পোশাকে নাপাকি লেগেছে, তাহলে যদি সম্ভব হয় তবে সাথে সাথে পোশাক পরিবর্তন করে বা নাপাকি ধুয়ে ফেলে নামাজ চালিয়ে যাবে। আর যদি সম্ভব না হয়, তাহলে নামাজ ভেঙে দিয়ে পুনরায় নামাজ পড়বে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৬১)
- কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু নামাজ শেষ করার পর জানতে পেরেছেন, তাই নামাজ শুদ্ধ হয়ে গেছে এবং কাজা করতে হবে না।
সারকথা: আপনার নামাজ ও তিলাওয়াত শুদ্ধ হয়েছে এবং কাজা করতে হবে না। তবে ভবিষ্যতে নামাজ ও তিলাওয়াতের আগে পোশাক ও শরীরের পবিত্রতা যাচাই করার অভ্যাস করুন। আর অজান্তে হওয়ায় কোনো গুনাহও হবে না, ইনশাআল্লাহ।
দলিলসমূহ:
- সূরা বাকারা: ২৮৬ — ভুল ও বিস্মৃতির ক্ষেত্রে ক্ষমার ঘোষণা।
- হাদিস: “আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও বাধ্য হয়ে করা কাজ ক্ষমা করা হয়েছে।” (ইবনে মাজাহ, বায়হাকী)
- রদ্দুল মুহতার (১/৩১৭): অজ্ঞতাবশত নাপাক পোশাকে নামাজ পড়লে নামাজ শুদ্ধ, কাজা নেই।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৬১): নামাজ শেষে জানতে পারলে নামাজ শুদ্ধ, কাজা নেই।
- আল-হিদায়াহ (১/৮২): নাপাকির অজ্ঞতা ‘উযর’ হিসেবে গণ্য।