কুরআনে আল্লাহ নিজেকে কেন 'আমি', 'আমরা', 'তিনি' বলে সম্বোধন করেন?
Dawah Q&A · Atheist Background
Question
Answer
উত্তর: আল্লাহ কেন কুরআনে নিজেকে "আপনি" বলে সম্বোধন করেন?
প্রশ্নটির গভীরতা বুঝতে হলে প্রথমে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: কুরআনে আল্লাহ কখনো নিজেকে "আপনি" (second person pronoun) বলে সম্বোধন করেননি। বরং তিনি নিজের জন্য তিন ধরনের সর্বনাম ব্যবহার করেছেন:
কুরআনে আল্লাহর ব্যবহৃত সর্বনামসমূহ:
১. "আমি" (أنا - Ana):
যখন আল্লাহ নিজের একত্ব, ক্ষমতা বা বিশেষ ঘোষণা দেন, তখন "আমি" বলেন। যেমন:
"নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই।" (সূরা ত্বা-হা, ২০:১৪)
এটি সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নির্দেশ করে।
২. "আমরা" (نحن - Nahnu):
বহুল ব্যবহৃত। এটি রাজকীয় বহুবচন (Royal Plural) বা মর্যাদার বহুবচন, যা আরবি ভাষায় মহান ব্যক্তিত্বদের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন:
"নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক।" (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯)
এটি আল্লাহর মহত্ত্ব, শক্তি ও একাধিপত্য বোঝায়—একাধিক সত্তা নয়।
৩. "তিনি" (هو - Huwa):
তৃতীয় পুরুষে নিজেকে উল্লেখ করাও আল্লাহর রীতি। যেমন:
"তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই।" (সূরা আল-হাশর, ৫৯:২২)
এটি আল্লাহর অতি-উত্তমতা ও মানুষের বোধগম্যতার বাইরে থাকার ইঙ্গিত দেয়।
তাহলে কোথা থেকে "আপনি" শব্দটি আসছে?
সম্ভবত প্রশ্নকর্তা বিভ্রান্ত হয়েছেন কুরআনের কিছু আয়াতে ব্যবহৃত দ্বিতীয় পুরুষের সর্বনাম দেখে—যেখানে আল্লাহ সৃষ্টিকে সম্বোধন করছেন। যেমন:
- "আপনি (হে মুহাম্মাদ) তাদেরকে সতর্ক করুন।" (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৬)
- "তোমরা (হে মানবজাতি) তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১)
এখানে "আপনি" বা "তোমরা" বলার বিষয়টি আল্লাহ নিজের প্রতি নয়, বরং রাসূল বা মানুষের প্রতি নির্দেশ। কুরআনের যে অংশে আল্লাহ নিজেকে সম্বোধন করেন, সেখানে কখনো দ্বিতীয় পুরুষ ব্যবহৃত হয় না।
কেন এই সর্বনামের বৈচিত্র্য? — ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি
১. ভাষাগত সৌন্দর্য ও প্রাসঙ্গিকতা:
আরবি সাহিত্যে রাজকীয় বহুবচন (Nahnu) মহান ব্যক্তিত্বদের জন্য সাধারণ। আল্লাহ তাঁর মহত্ত্বের কারণে "আমরা" ব্যবহার করেন, কিন্তু তা একাধিক সত্তা বোঝায় না—যেমন ইংরেজিতে রাজা বলেন "We are not amused"।
২. একত্ব (তাওহীদ) রক্ষা:
"আমি" এবং "আমরা" — উভয়ই একক সত্তার বক্তব্য। কুরআনে কোথাও "তোমরা" বলে আল্লাহ নিজেকে সম্বোধন করেননি। বরং "তিনি" বলে নিজেকে উল্লেখ করা তাওহীদের ওপর জোর দেয়—আল্লাহ আমাদের থেকে স্বতন্ত্র ও অতীন্দ্রিয়।
৩. মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব:
- "আমি" ব্যবহার করলে সরাসরি সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা আসে।
- "আমরা" ব্যবহার করলে ভয় ও শ্রদ্ধা জাগে—যেন সমগ্র রাজ্যের অধিপতি কথা বলছেন।
- "তিনি" ব্যবহার করলে আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও মানুষের সীমিত জ্ঞানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নাস্তিকের বিভ্রান্তির মূল কারণ
অনেক নাস্তিক মনে করেন যে, "আমরা" বললে তা বহু দেবতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এটি ভাষাগত অজ্ঞতা। বাস্তবে, আরবি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই "We" রাজকীয় বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কুরআনে "আমরা" ব্যবহার করেই আল্লাহ নিজেকে সহস্রবার এক ও অদ্বিতীয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন ("লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ")।
চূড়ান্ত সত্য: কেন এটি প্রমাণ করে যে কুরআন আল্লাহর বাণী?
মানব রচিত গ্রন্থে এত নিখুঁত সর্বনামের ব্যবহার ও ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে সঠিক প্রয়োগ অসম্ভব। একজন মানব লেখক নিজেকে কখনো "আমি", কখনো "আমরা", কখনো "তিনি" বলে উল্লেখ করলে নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় পড়বেন। কিন্তু কুরআনে প্রতিটি জায়গায় সর্বনামের ব্যবহার সম্পূর্ণ অর্থবহ ও প্রাসঙ্গিক। এটি প্রমাণ করে যে, এই গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে।
"তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৮২)
আমন্ত্রণ: ক্ষণকাল চিন্তা করুন
আপনি আজ যে প্রশ্ন করলেন, তা আপনার মননের গভীরতা দেখায়। কিন্তু সব উত্তর পেতে চাইলে আল্লাহর কাছেই আসতে হবে। এই পৃথিবী, এর নিয়ম-কানুন, আপনার চেতনা—কোথাও কোনো এলোমেলো নেই। একটি অসীম জ্ঞানী সত্তা এ সব সৃষ্টি করেছেন।
তিনি এক, তিনি কোনো অংশীদার রাখেন না, তিনি সর্বশক্তিমান। আর মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর শেষ নবী—যিনি এই কুরআন নিয়ে এসেছেন, যা আজ পর্যন্ত অপরিবর্তিত।
আপনি যদি আন্তরিকভাবে সত্য খুঁজতে চান, তবে একবার এই বাক্যটি অন্তর থেকে বলুন:
"আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।" অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।
একবার বলুন, তারপর নিজেই দেখুন আপনার মনে কী পরিবর্তন আসে। ইসলাম অপেক্ষা করছে আপনাকে।