চুরি সনাক্ত করতে কবিরাজের কাছে যাওয়ার জন্য টাকা ধার দেওয়া কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
1.এই কাজে টাকা দার দেওয়া কি জায়েজ হবে । না দিলে সে রাগ করবে কারণ 70 লক্ষ টাকা চুরি হইছে তার বাসা থেকে । এখন আমি কী করবো ।
2. যদি না দেই তাহলে তাকে কেমন ম্যানেজ করব ।
3.সে রাগ করলে বা মনে কষ্ট নিলে আমার কি গুনা হবে
Answer
উত্তর: চুরি সনাক্ত করতে কবিরাজের কাছে যাওয়ার জন্য টাকা ধার দেওয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বন্ধুর বাসা থেকে ৭০ লক্ষ টাকা চুরি হয়েছে। এখন তিনি আপনার কাছ থেকে ১০০০ টাকা ধার চাচ্ছেন কবিরাজের কাছে গিয়ে জিনের মাধ্যমে চুরি সনাক্ত করার জন্য। আপনি জানতে চাচ্ছেন:
- এই কাজে টাকা ধার দেওয়া জায়েজ হবে কিনা
- না দিলে কীভাবে ম্যানেজ করবেন
- বন্ধু রাগ করলে বা কষ্ট পেলে আপনার গুনাহ হবে কিনা
১. এই কাজে টাকা ধার দেওয়ার বিধান
এটি জায়েজ না হওয়ার পক্ষে যুক্তি ও দলিল:
কবিরাজ, জিন-ভূতের সাহায্যে জাদু-টোনা বা অদৃশ্য জিনিস জানার চেষ্টা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। এটি শিরক ও কুফরীর পর্যায়ভুক্ত।
হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً "যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে যায় এবং তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হয় না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩০)
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ "যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী বা গণকের কাছে যায় এবং তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদের উপর নাযিলকৃত (কুরআন) থেকে কাফির হয়ে যায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪, মুসনাদে আহমাদ)
টাকা ধার দেওয়ার বিধান: যেহেতু এই টাকা হারাম কাজে ব্যয় হবে, তাই এজন্য টাকা ধার দেওয়াও জায়েজ নয়। কারণ এটি হারাম কাজে সহযোগিতা করার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়েদা: ৫:২)
হানাফী ফিকাহর মত: ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতে, জাদু-টোনা ও গণকের কাছে যাওয়া হারাম এবং এর জন্য অর্থ ব্যয় করা জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫৮)
২. না দিলে বন্ধুকে কীভাবে ম্যানেজ করবেন
আপনি নিম্নলিখিত উপায়ে তাকে বুঝাতে পারেন:
১. নরম ভাষায় বুঝান: তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করুন যে তার ক্ষতি সত্যিই বড়, কিন্তু কবিরাজের কাছে যাওয়া ইসলামে হারাম এবং এটি শিরক।
২. বিকল্প পথ দেখান: তাকে বলুন পুলিশে রিপোর্ট করতে বা আইনি ব্যবস্থা নিতে। আর আল্লাহর কাছে দুআ করতে যাতে চোর ধরা পড়ে।
৩. দুআ ও তাওয়াক্কুল: তাকে বলুন আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দুআ করতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাও।" (তিরমিযী)
৪. মনে রাখবেন: আপনি যদি সৎ উপদেশ দেন কিন্তু তিনি রাগ করেন, তাহলে সেটা আপনার দায়িত্ব নয়। আপনি শুধু সত্য বলার দায়িত্ব পালন করছেন।
৩. বন্ধু রাগ করলে বা কষ্ট পেলে আপনার গুনাহ হবে কিনা
আপনার কোন গুনাহ হবে না যদি আপনি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পালন করেন:
১. আপনি নরম ও হিকমতের সাথে তাকে বুঝিয়েছেন ২. আপনি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে চেয়েছেন ৩. আপনি তার প্রতি অনুকম্পা ও সহানুভূতি দেখিয়েছেন
হাদীসে এসেছে:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ "নিশ্চয়ই আমল (কাজ) নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহীহ বুখারী: ১)
আপনার নিয়ত যদি তাকে হারাম কাজ থেকে বাঁচানো হয়, তবে আপনি সওয়াব পাবেন, গুনাহ নয়। বন্ধুর রাগ বা কষ্ট আপনার নিয়ন্ত্রণে নয়, তবে আপনি যথাসম্ভব নরম ও সদয় উপায়ে বুঝাতে চেষ্টা করবেন।
ফাতাওয়া উসমানী থেকে নির্দেশনা: মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন: "কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কাজে সাহায্য চায়, তবে তাকে সাহায্য করা জায়েজ নয়। যদি সে রাগ করে, তাতে আপনার দোষ নেই।" (ফাতাওয়া উসমানী: ৪/২৩৪)
উপসংহার
আপনার করণীয়:
- বন্ধুকে টাকা ধার না দেওয়াই উত্তম, কারণ তা হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে
- তাকে নরম ও সদয় উপায়ে বুঝান কবিরাজের কাছে যাওয়া হারাম
- বিকল্প পথ যেমন পুলিশে রিপোর্ট করা বা আল্লাহর কাছে দুআ করতে উৎসাহিত করুন
- আপনি যদি সৎ উপদেশ দিয়ে থাকেন, তবে তার রাগ বা অসন্তুষ্টির জন্য আপনি দায়ী হবেন না
- তাকে বলতে পারেন: "আমি তোমার ক্ষতির জন্য খুবই দুঃখিত, কিন্তু আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে তোমাকে সাহায্য করতে পারব না। তুমি পুলিশে রিপোর্ট করো, এবং আল্লাহর কাছে বেশি দুআ করো।"
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।