স্বপ্নে পূর্ণিমার চাঁদ দেখার ইসলামী ব্যাখ্যা কি? এবং সন্তানহীন মহিলার জন্য সন্তান লাভের কুরআন-হাদীস সম্মত আমল সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
হুজুর আমি স্বপ্নে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখেছিলাম। যা খুবই উজ্জ্বল ছিল। আমি রুমের জানালা দিয়ে তা দেখছিলাম।এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি হতে পারে?
আর নি: সন্তান মহিলার জন্য সন্তান লাভের কোন আমল আছে কি?
Answer
উত্তর দেওয়া হলো: বাংলা ভাষায়, হানাফি মাসলাক অনুসারে
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রথম অংশ: স্বপ্নে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা
স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন, স্বপ্ন তিন প্রকার:
১. আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ (রু’য়া),
২. শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিপ্রদর্শন,
৩. নিজের মনের কল্পনা (নাফসের খেয়াল)।
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪২০০)
আপনার স্বপ্নে উজ্জ্বল পূর্ণিমার চাঁদ দেখা এবং জানালা দিয়ে তা দেখা—এটি সাধারণত ইতিবাচক আলামত। ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুসারে:
- পূর্ণিমার চাঁদ = সুন্দরী স্ত্রী, নেককার সন্তান, বা উত্তম নেতা/শাসক।
- জানালা দিয়ে দেখা = নিকটবর্তী কোনো সুখবর বা আশীর্বাদ যা আপনার জীবনে প্রবেশ করবে।
(তাফসীরে রু’য়া, ইবনে সিরীন, অধ্যায়: চাঁদ)
হানাফি ফকীহ ও স্বপ্নবিশারদগণ বলেন:
“স্বপ্নে চাঁদ দেখা দ্বীনের নূর ও হিদায়াতের প্রতীক। আর পূর্ণিমার চাঁদ ইমানের পূর্ণতা ও কল্যাণের ইঙ্গিত বহন করে।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৪৫৭; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫৪০)
উপসংহার: এই স্বপ্নটি ভালো। তবে কোনো বিশেষ ঘটনার পূর্বাভাস বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন এবং ভালো আমল চালিয়ে যান।
দ্বিতীয় অংশ: সন্তানহীন মহিলার জন্য সন্তান লাভের আমল
সন্তানহীন দম্পতির জন্য কুরআন-হাদীস ও হানাফি কিতাবে বর্ণিত কিছু বিশেষ আমল নিচে দেওয়া হলো:
১. নবী যাকারিয়্যা (আ.)-এর দু‘আ (পবিত্র কুরআন)
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
উচ্চারণ: “রাব্বি লা তাযারনী ফারদাও ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন।”
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে একাকী (সন্তানহীন) রেখো না, আর তুমিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।”
(সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯)
এই দু‘আটি ফজরের পর, তাহাজ্জুদে ও শেষ রাতে অধিক পরিমাণে পড়বেন।
২. নবী যাকারিয়্যা (আ.)-এর আরেক দু‘আ
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
উচ্চারণ: “রাব্বি হাবলী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান তাইয়িবাহ্, ইন্নাকা সামী‘উদ দু‘আ।”
অর্থ: “হে আমার রব! তোমার কাছে থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করো। নিশ্চয় তুমি দু‘আ শুনে থাকো।”
(সূরা আলে-ইমরান: ৩৮)
৩. সূরা মারইয়াম ও সূরা আল-ইমরান তিলাওয়াত
প্রতিদিন সূরা মারইয়াম ও সূরা আলে-ইমরানের যে আয়াতগুলোতে সন্তানের কথা এসেছে (যেমন: ৩:৩৮-৪১ ও ১৯:২-১৫) তা পড়া এবং পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করানো।
(বাহিশতী জেওর, ৮ম অধ্যায়; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫৪০)
৪. “ইয়া ওয়াহ্হাব” (يَا وَهَّابُ) জপ করা
আল্লাহর নাম “ইয়া ওয়াহ্হাব” (অর্থ: যিনি অঢেল দান করেন) প্রতিদিন ১০০ বার বা ১০০০ বার পড়া। বিশেষ করে শেষ রাতে এবং নামাজের পর।
(আল-আদকার, ইমাম নববী; বাহিশতী জেওর, ৮/৩)
৫. নবী (ﷺ)-এর দু‘আ
হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“আল্লাহুম্মা ইন্নী আস্আলুকা মিন ফাদ্বলিকা…”
এছাড়া নিম্নোক্ত দু‘আটি অধিক পড়বেন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
উচ্চারণ: “রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুর্রাতা আ‘ইউন।”
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন।”
(সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
৬. দান-সাদকা ও ইস্তিগফার
- বেশি বেশি দান-সাদকা করা (বিশেষ করে শুক্রবারে)।
- “আস্তাগফিরুল্লাহ” বেশি পড়া।
- ফকীহগণ বলেন: যারা সন্তান চান, তারা প্রতিদিন ১০০ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যোয়ালিমীন” পড়বেন।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৪/৪৭২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩২০)
৭. বিশেষ আমল (বাহিশতী জেওর থেকে)
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর “বাহিশতী জেওর” এ লিখেছেন:
“সন্তান লাভের জন্য সূরা আল-ফাতিহা ৭ বার, সূরা ইখলাস ৭ বার, সূরা ফালাক ৭ বার ও সূরা নাস ৭ বার পড়ে পানি বা মধুতে ফুঁ দিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পান করবেন। এটি ৭ দিন বা ৪০ দিন পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারেন।”
(বাহিশতী জেওর, দশম অধ্যায়; দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া)
মনে রাখবেন: সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে দান। তাই ধৈর্য সহকারে ও নিয়মিত আমল করতে হবে। চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে খুশি রাখুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থ:
- কুরআনুল কারীম (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯, সূরা আলে-ইমরান: ৩৮)
- সহীহ বুখারী ও মুসলিম
- তাফসীরে ইবনে সিরীন (স্বপ্নের ব্যাখ্যা)
- বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি শফি উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মাহমুদ হাসান)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হানাফি ফতোয়ার সংগ্রহ)
আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।