বিয়ের ইস্তেখারার ক্ষেত্রে ছেলে সম্পদশালী হলে বা মেয়ে সুন্দরী হলে নাকি ইস্তিখারা পজিটিভ আসে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একটা ইসলামী ঘরানার বইয়ের (বইটার নাম কিছুতেই মনে পড়ছেনা আমার।বিয়ের আগে টাইপ একটা নাম ছিলো) কিছু লিখা ফেসবুকে একজন পোস্ট দিয়েছে। সেখানে পড়লাম লেখক লিখেছেন হারাম সম্পর্কে অথবা বিয়ের উদ্দেশ্যে কারো সাথে কথা হলে সেসব নিয়ে ইস্তিখারা করলে সবসময় পজিটিভ আছে।আবার যদি ছেলে সম্পদশালী হয়,মেয়ে সুন্দরী হয় তাহলেও নাকি ইস্তিখারা পজিটিভ আসে। এটা কি আদৌও সত্য? আর সত্য হলে ইস্তিখারা কখন করা উচিত তাহলে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইস্তিখারা একটি পবিত্র ইবাদত ও দু‘আ, যা আল্লাহর নিকট কল্যাণ প্রার্থনার জন্য করা হয়। এটি কোনো জ্যোতিষশাস্ত্র বা ভবিষ্যদ্বাণী নয়। ফেসবুকে যে পোস্টটি আপনি পড়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। নিচে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. ইস্তিখারার প্রকৃতি ও শর্ত
ইস্তিখারা শুধুমাত্র হালাল ও জায়েজ কাজের জন্য করা যায়। কোনো হারাম কাজের জন্য ইস্তিখারা করাই জায়েজ নয়। যেমনঃ পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক, হারাম উপায়ে উপার্জন ইত্যাদি। যদি কেউ কোনো হারাম কাজের জন্য ইস্তিখারা করে, তবে তা মূলত আল্লাহর নিকট হারাম কাজের কল্যাণ চাওয়া – যা আল্লাহর নাফরমানি, তাই ইস্তিখারা কবুল হবে না বরং গুনাহ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৬৯)
সুতরাং লেখকের বক্তব্য “হারাম সম্পর্কে ইস্তিখারা করলেও সবসময় পজিটিভ আসে” – এটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। ইস্তিখারা হারাম বৈধ করার মাধ্যম নয়।
২. সম্পদশালী/সুন্দরী হওয়ার কারণে ইস্তিখারায় পজিটিভ আসা
ইস্তিখারার ফলাফল নির্ভর করে বাহ্যিক সম্পদ, সৌন্দর্য বা দুনিয়াবি সুবিধার ওপর নয়। বরং ইস্তিখারার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয় – “হে আল্লাহ! যদি এই কাজটি আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা সহজ করে দিন; আর যদি অকল্যাণকর হয়, তবে তা থেকে আমাকে সরিয়ে দিন।” (বুখারি, হাদিস: ১১৬২)
সুতরাং কোনো ছেলের ধনী হওয়া বা মেয়ের সুন্দরী হওয়া ইস্তিখারার ইতিবাচকতার কারণ নয়। বরং আসল কল্যাণ হলো দীনের উপর অবিচল থাকা, পরকালে সফলতা লাভ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ
“কোনো বস্তুর সৌন্দর্য দেখে তোমরা মুগ্ধ হয়ো না, বরং তার দীনদারি দেখো।” (তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
সুতরাং দুনিয়াবি সম্পদ বা সৌন্দর্য ইস্তিখারার ফলাফল নির্ধারণ করে না।
৩. ইস্তিখারা কখন করা উচিত?
ইস্তিখারা করা উচিত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রেঃ
- যখন কোনো হালাল ও জায়েজ কাজের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা বা অনিশ্চয়তা থাকে।
- যেমনঃ বিয়ে, চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা, ভ্রমণ, স্থান পরিবর্তন ইত্যাদি।
- ইস্তিখারা করার পূর্বে কাজটি হালাল কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। যদি কাজটি হারাম বা সন্দেহজনক হয়, তবে তাতে ইস্তিখারা না করে বরং ত্যাগ করাই উত্তম।
ইস্তিখারা করে তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রেখে কাজ শুরু করা উচিত। কোনো নির্দিষ্ট রঙের স্বপ্ন দেখা বা বিশেষ অনুভূতি পাওয়া জরুরি নয়। বরং কাজটি সহজে সম্পন্ন হওয়া বা বাধা সৃষ্টি হওয়াকে ইস্তিখারার ফলাফল হিসেবে গণ্য করা যায়। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৭০; বেহেশতী জেওর, ১/২২৪)
৪. ইস্তিখারা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা
ইস্তিখারা দ্বারা ভবিষ্যৎ জানা যায় না, বরং এটি আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার একটি দু‘আ। এর কোনো ‘পজিটিভ’ বা ‘নেগেটিভ’ ফলাফল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বের হয় না। বরং একজন মুমিন ইস্তিখারা করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং যা ঘটে তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) লিখেছেনঃ
“ইস্তিখারা হলো দু‘আ ও ইবাদত, কোনো শুভ-অশুভ গণনার মাধ্যম নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩)
৫. সারসংক্ষেপ
| ভুল ধারণা | সঠিক ইসলামি নির্দেশনা | |-----------|----------------------| | হারাম সম্পর্কে ইস্তিখারা করলে পজিটিভ আসে | হারাম কাজের জন্য ইস্তিখারা জায়েজ নয় এবং তা কখনো কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে না | | ছেলে ধনী বা মেয়ে সুন্দরী হলে ইস্তিখারা পজিটিভ আসে | ইস্তিখারা দুনিয়াবি গুণের ওপর নির্ভর করে না; বরং দ্বীনি কল্যাণ বিবেচিত হয় | | ইস্তিখারার ‘পজিটিভ’ বা ‘নেগেটিভ’ ফলাফল বের করতে হয় | ইস্তিখারা শুধু দু‘আ; এর পরবর্তী কাজের সুবিধা বা অসুবিধা দ্বারাই কল্যাণ বোঝা যায় |
পরামর্শঃ আপনি ফেসবুকে কোনো অজ্ঞ লেখকের বিভ্রান্তিকর পোস্টে বিশ্বাস করবেন না। বরং সরাসরি নির্ভরযোগ্য আলেম বা ইসলামি গ্রন্থ থেকে মাসআলা জানুন। ইস্তিখারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, এটিকে ভিত্তিহীন কুসংস্কার থেকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন)