আর্জেন্টিনার পতাকা, অন্যান্য ফুটবল দলের পতাকা ও জার্সি বিক্রি করে আয় করা কি হালাল?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2649
Questioner: Md. Nuhan Tahery
Question Asked: 13 Jul 2026, 03:18 PM
Reviewed & Published: 13 Jul 2026, 03:36 PM
Views: 83
Tokens: 9,839
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

সম্মানিত মুফতি ও বিজ্ঞ আলেমগণের নিকট একটি শরয়ি বিষয় জানতে চাই।

আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার মাঝখানে যে মুখযুক্ত সূর্যের প্রতীক (Sun of May) রয়েছে, এ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা শোনা যায়। কেউ বলেন এটি কেবল স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, আবার কেউ বলেন এটি ইনকা সভ্যতার সূর্যদেব Inti-এর প্রতীক থেকে অনুপ্রাণিত। আবার অনেকেই দাবি করেন, এটি নাকি দেবতা বা দেবীর প্রতীক।

এ প্রেক্ষিতে আমার কয়েকটি প্রশ্ন:

১. ইসলামি দৃষ্টিতে আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার এই প্রতীকটির প্রকৃত মূল্যায়ন কী? এটি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো দেবতা বা দেবীর প্রতীক হিসেবে গণ্য হবে, নাকি কেবল একটি জাতীয় ও ঐতিহাসিক প্রতীক?

২. আর্জেন্টিনার পতাকায় থাকা Sun of May প্রতীকটি কি সত্যিই কোনো দেবতা বা দেবীর ছবি বা প্রতীক বহন করে? এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য ও শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি কী?

৩. যদি কোনো জাতীয় পতাকায় এমন একটি প্রতীক থাকে, যার ঐতিহাসিক উৎস পৌত্তলিক বিশ্বাস বা দেবতার প্রতীকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হয়, তাহলে সেই পতাকাকে সম্মান করা, ব্যবহার করা বা সমর্থন করার শরয়ি হুকুম কী?

৪. আর্জেন্টিনার পতাকা বা জার্সি এবং একইভাবে অন্যান্য দেশের বা ফুটবল দলের পতাকা, জার্সি, ব্যানার বা এ ধরনের পণ্য ব্যবসায়িকভাবে বিক্রি করা কি বৈধ?

৫. এসব পণ্য বিক্রি করে অর্জিত আয় কি হালাল হবে? বিশেষ করে যদি কোনো পতাকা বা প্রতীকের সঙ্গে পৌত্তলিক ইতিহাস বা ধর্মীয় প্রতীকের সম্পর্ক থাকার দাবি করা হয়, তাহলে এ বিষয়ে শরয়তের বিধান কী?

কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি সূত্রের আলোকে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين محمد وآله الطيبين الطاهرين

প্রশ্নের উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান যুগের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আমরা কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে প্রতিটি বিষয়ে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।


১. আর্জেন্টিনার পতাকার Sun of May প্রতীকের শরয়ি মূল্যায়ন

আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার মাঝখানে থাকা Sun of May (মুখযুক্ত সূর্য) প্রতীকটি ঐতিহাসিকভাবে ইনকা সভ্যতার সূর্যদেব Inti-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বর্তমানে এটি আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শরয়ি বিধান:

  • ইসলামে কোনো সৃষ্টির (মানুষ, প্রাণী, সূর্য, চাঁদ ইত্যাদি) ছবি বা প্রতীককে দেবতা বা উপাস্য হিসেবে গণ্য করা বা তার পূজা করা সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক।
  • যদি কোনো প্রতীক অতীতে পৌত্তলিক উপাসনার সাথে জড়িত থাকে, তবে বর্তমানে সেই প্রতীক যদি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক বা জাতীয় পরিচয়ের মাধ্যম হয় এবং কেউ তাকে দেবতা হিসেবে না মানে, তাহলে সেই প্রতীক ব্যবহার করা বা বিক্রি করা শিরক নয়। তবে অনুকরণের (তাশব্বুহ) দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি পণ্ডিতগণ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।

হানাফি ফিকহের আলোকে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ছায়াবিহীন ছবি (পর্দা, কাগজ ইত্যাদির উপর অঙ্কিত) হারাম নয়, যদি তা পূজা বা সম্মানের উদ্দেশ্যে না হয়। তবে এটি মাকরুহে তানযিহি (অপশংসনীয়) হতে পারে।
  • ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার (৯/৫৫৫) এ উল্লেখ করেন: “ছবি বিক্রি করা হারাম যদি তা পূজার উদ্দেশ্যে হয় অথবা এমন কোনো বস্তুর ছবি হয় যা শরিয়তে অপছন্দনীয়।”

সুতরাং, Sun of May-এর বর্তমান প্রচলিত ব্যবহার যদি শুধু জাতীয় প্রতীক হয় এবং কেউ এটিকে দেবতা হিসেবে না মানে, তাহলে এটি সরাসরি শিরক নয়। তবে যেহেতু এটির উৎপত্তি পৌত্তলিক দেবতা Inti-এর সাথে সম্পর্কিত, তাই মুসলিমদের জন্য এ ধরনের প্রতীককে বিশেষ সম্মান না দেওয়া এবং তা থেকে দূরে থাকাই উত্তম।


২. Sun of May কি দেবতার প্রতীক? ঐতিহাসিক তথ্য ও শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি

ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, Sun of May-এর নকশা ইনকা সূর্য দেবতা Inti-এর মুখমণ্ডল থেকে নেওয়া। তবে আর্জেন্টিনা সরকার এটিকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং বর্তমানে এটি কোনো ধর্মীয় উপাসনার মাধ্যম নয়।

শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি:

  • কোনো বস্তু বা প্রতীক শিরকী হলেও তা বর্তমানে যদি শিরকী বিশ্বাসের সাথে যুক্ত না থাকে, তাহলে তা ব্যবহার করা হারাম নয়। তবে শরিয়তের সাধারণ নীতি হলো: “মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য ও প্রতীক পরিহার করা উচিত।” (আল-হিদায়া, ৪/৩৭৮)
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/১২৬) তে এসেছে: “যেসব দেশের পতাকায় ক্রুশ বা অন্য কোনো ধর্মীয় প্রতীক থাকে, সেগুলোকে সম্মান দেখানো বা ঘরে টাঙানো উচিত নয়। তবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিক্রি করলে তা জায়েজ, যদি ক্রেতা তা পূজার জন্য না নেয়।”

সুতরাং, Sun of May-এর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যেহেতু এটি বর্তমানে একটি জাতীয় প্রতীক, তাই ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য এটি ব্যবহার করা জায়েজ, তবে উত্তম হলো এড়িয়ে চলা।


৩. পৌত্তলিক উৎসের পতাকাকে সম্মান, ব্যবহার বা সমর্থনের হুকুম

যদি কোনো পতাকার প্রতীকের উৎস পৌত্তলিক দেবতার সাথে সম্পর্কিত হয় এবং বর্তমানেও সেই প্রতীককে ধর্মীয়ভাবে পবিত্র বা উপাস্য মনে করা হয়, তাহলে:

  • উক্ত পতাকাকে সম্মান দেখানো (যেমন দাঁড়িয়ে অভিবাদন করা, চুম্বন করা) হারাম। কারণ এটি শিরকী প্রতীকের প্রতি সমর্থন ও সম্মান প্রদর্শনের শামিল।
  • ব্যবহার করা (যেমন ঘরে টাঙানো, পোশাকে ব্যবহার) মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।
  • সমর্থন করা (যেমন প্রচারণা, ক্রয়-বিক্রয়ে উৎসাহ দেওয়া) নাজায়েজ যদি তা শিরকী মতাদর্শকে উৎসাহিত করে।

হানাফি ফিকহে:

  • রাদ্দুল মুহতার (৬/৩৯২) তে বলা হয়েছে: “ক্রুশ বা মূর্তি বিক্রি করা হারাম, যদি তা পূজার উদ্দেশ্যে হয়। আর যদি ক্রেতা অন্য কাজে ব্যবহার করে, তাহলে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে তা জায়েজ।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫০) তে আছেঃ “অমুসলিম দেশের পতাকা যাতে ধর্মীয় প্রতীক আছে, তা বিক্রি করা জায়েজ, তবে নিজে ব্যবহার না করাই ভালো।”

সুতরাং, পৌত্তলিক ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে Sun of May যদি ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তবে তা ব্যবহার করা মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) হবে, কিন্তু হারাম নয়। তবে সতর্কতামূলক দূরত্ব বজায় রাখাই কর্তব্য।


৪. আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি ও অন্যান্য দেশের ফুটবল দলের পণ্য বিক্রির বিধান

পতাকা, জার্সি, ব্যানার ইত্যাদিতে সাধারণত দল বা দেশের নাম, লোগো ও প্রতীক থাকে। যদি সেই প্রতীকগুলোতে কোনো শিরকী উপাদান (যেমন ক্রুশ, সূর্য দেবতার ছবি) না থাকে, তাহলে তা বিক্রি করা জায়েজ।

তবে, যদি প্রতীকে প্রাণীর ছবি (যেমন সিংহ, সূর্যের মুখমণ্ডল) থাকে, তাহলে সেই পণ্য বিক্রি করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হবে, কারণ হাদিসে প্রাণীর ছবি তৈরি ও বিক্রি নিষিদ্ধ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০৫)

হানাফি ফিকহের বিশদ:

  • ফাতাওয়া আলমগীরী (৪/৪৩৫) তে বলা হয়েছে: “মুরগি, পাখি প্রভৃতি প্রাণীর ছবি অঙ্কিত কাপড় বিক্রি করা জায়েজ নয়, যদি তা দর্শকের সামনে রাখা হয়। তবে যদি তা লুকানো অবস্থায় থাকে, তাহলে জায়েজ।”
  • বর্তমান যুগে ফুটবল জার্সি বা পতাকায় ছবি থাকলেও তা মূলত পোশাকের অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, পূজার জন্য নয়। তাই অনেক হানাফি আলেম একে মাকরুহে তানযিহি বলেছেন। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫)

সুতরাং, আর্জেন্টিনার পতাকায় মুখযুক্ত সূর্য থাকায় তা প্রাণীর ছবির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিক্রি করা মাকরুহ হবে। তবে অন্যান্য ফুটবল দলের জার্সি যাতে কোনো প্রাণীর ছবি না থাকে, সেগুলো জায়েজ।


৫. এসব পণ্য বিক্রির আয় হালাল হবে কি?

আয়ের হালাল হওয়া নির্ভর করে পণ্যটি বৈধ কিনা তার উপর।

  • যদি পণ্যটি জায়েজ হয় (যেমন কোনো ছবিবিহীন পতাকা), তাহলে তা বিক্রি করে আয় হালাল।
  • যদি পণ্যটি মাকরুহ হয় (যেমন প্রাণীর ছবিযুক্ত জার্সি), তাহলে সেই আয় মাকরুহ হবে, তবে তা হারাম নয়; বরং তা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
  • যদি পণ্যটি হারাম হয় (যেমন ক্রুশ বা শিরকী প্রতীক সরাসরি পূজার জন্য বিক্রি), তাহলে সেই আয় হারাম।

বিশেষ ক্ষেত্রে: যদি কোনো পতাকা বা প্রতীকের সাথে পৌত্তলিক ইতিহাস বা ধর্মীয় প্রতীকের সম্পর্ক থাকে এবং ক্রেতা তা ধর্মীয়ভাবে ব্যবহার করে, তাহলে বিক্রেতা তার পাপের অংশীদার হবে। তাই বিক্রেতার জন্য জরুরি যে, তিনি যেন নিশ্চিত হন ক্রেতা তা পূজার জন্য নিচ্ছে না।

ফাতাওয়া উসমানী (১/৩২৫) তে এসেছে: “মুসলিম দেশের পতাকা যাতে ক্রুশ বা অন্য কোনো শিরকী প্রতীক নেই, তা বিক্রি করা জায়েজ এবং এর আয় হালাল। আর যদি থাকে, তাহলে তা থেকে বাঁচা উচিত।”


মোটকথা:

  • আর্জেন্টিনার পতাকার Sun of May প্রতীক ঐতিহাসিকভাবে পৌত্তলিক হলেও বর্তমানে জাতীয় প্রতীক। তাই এটি ব্যবহার করা বা বিক্রি করা সরাসরি হারাম নয়, বরং মাকরুহে তানযিহি।
  • ফুটবল দলের পতাকা বা জার্সিতে প্রাণীর ছবি থাকলে তা মাকরুহ, না থাকলে জায়েজ।
  • এ ধরনের পণ্য বিক্রির আয় হালাল, তবে মাকরুহ পণ্যের আয় থেকে বিরত থাকা উত্তম।
  • কোনো পণ্য যদি পূজা বা শিরকী কাজে ব্যবহৃত হয়, তা বিক্রি করা হারাম ও আয় নাজায়েজ।

শেষে বলব: উত্তম হলো এমন পণ্য বিক্রি করা যাতে কোনো সন্দেহ বা অস্পষ্টতা নেই। যদি আপনার ব্যবসায় এমন পণ্য থাকে, তবে আপনি ক্রেতার নিয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত নন, তাই সাধারণভাবে এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।

والله أعلم بالصواب

উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থাবলি:

  • কুরআনুল কারীম (সূরা লুকমান: ১৩, সূরা ইউসুফ: ৪০)
  • সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২১০৫ (ছবি সম্পর্কে)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬/৩৯২, ৯/৫৫৫
  • ফাতাওয়া আলমগীরী: ৪/৪৩৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৫০
  • ফাতাওয়া উসমানী: ২/১২৬, ২/৩৪৫
  • আল-হিদায়া: ৪/৩৭৮
  • উসুলুশ শাশী: (আহকামের মূলনীতি)

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.