’তুমাকে মুক্তি দিলাম’ নিয়ত ছাড়া বললে কি তালাক হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২.কেউ রাগে স্ত্রী মুক্তি দাও বললে স্বামী যদি বলে তুমি মুক্ত বা দিলাম এতে যদি তালাকের নিয়ত না থাকে তাহলে কি তালাক হয়?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্ন দুটি মূলত ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার ওপর ভিত্তি করে—কিনায়াত (অপ্রকাশ্য) শব্দে তালাকের নিয়তের প্রয়োজনীয়তা। নিচে হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুসারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. "তুমি মুক্ত" বা "মুক্তি দিলাম" কি তালাকের শব্দ?
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে, "তুমি মুক্ত" (أنت حرة) বা "মুক্তি দিলাম" ইত্যাদি শব্দ কিনায়াত (গোপন/আলঙ্কারিক) শব্দের অন্তর্ভুক্ত। কিনায়াত শব্দ দ্বারা তালাক সাব্যস্ত হতে হলে স্বামীর স্পষ্ট তালাকের নিয়ত (ইরাদা) থাকা আবশ্যক। নিয়ত না থাকলে তালাক হয় না।
প্রমাণ:
- আল-হিদায়া (كتاب الطلاق، باب الكنايات)-তে বলা হয়েছে:
"الكنايات لا يقع بها الطلاق إلا بالنية"
(কিনায়াত শব্দ দ্বারা তালাক নিয়ত ছাড়া পতিত হয় না।) - রদ্দুল মুহতার (৩/২৯৫)-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
"قوله: أنت حرة ونحوه... إن نوى الطلاق يقع، وإلا فلا"
(যদি তালাকের নিয়ত করে তাহলে তালাক পতিত হবে, অন্যথায় হবে না।) - ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (১/৩৭২)-তেও একই মত উল্লেখ আছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কোনো এলাকার 'উরফ (প্রচলিত রীতি)-তে যদি "মুক্ত" শব্দটি সরাসরি তালাক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা সরীহ (স্পষ্ট) শব্দে পরিণত হতে পারে। তবে বাংলাভাষী অঞ্চলে সাধারণত "তালাক" বা "ছাড়া" শব্দই তালাকের জন্য স্পষ্ট, আর "মুক্ত" শব্দটি দাসমুক্তি বা অন্য অর্থেই বেশি প্রচলিত। তাই সতর্কতামূলক এটি কিনায়াতই গণ্য হবে।
২. প্রথম প্রশ্নের জবাব: স্বামী যদি কষ্টদায়ক কথা না বলার নিয়তে "তুমি মুক্ত" বা "মুক্তি দিলাম" বলে
এই বাক্যে যদি স্বামীর তালাকের কোনো নিয়ত না থাকে বরং সে শুধু নিজেকে খারাপ কথা বলা থেকে বিরত রাখতে এমন বলে, তাহলে হানাফি মাজহাব অনুসারে তালাক পতিত হবে না। কারণ এটি কিনায়াত, আর নিয়ত ব্যতীত কিনায়াতে তালাক সাব্যস্ত হয় না।
তবে শরীয়তে এ ধরনের অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ ভবিষ্যতে ঝগড়ার সময় স্ত্রী এটিকে তালাক বলে দাবি করতে পারে। তাই স্বামীর উচিত স্পষ্ট ভাষায় বলা:
"আমি তোমাকে কোনো কষ্টদায়ক কথা বলব না" — এবং "তুমি মুক্ত" ইত্যাদি এড়িয়ে চলা।
৩. দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব: স্ত্রী "মুক্তি দাও" বললে স্বামী "তুমি মুক্ত" বা "দিলাম" বলে—নিয়ত না থাকলে কী হবে?
এক্ষেত্রেও মূলনীতি হলো—নিয়তের প্রয়োজনীয়তা। স্বামী যদি রাগের মাথায় বা স্ত্রীর কথার জবাবে এমন বলে, কিন্তু তার অন্তরে তালাকের ইচ্ছা না থাকে, তাহলে কিনায়াত শব্দ হওয়ায় তালাক পতিত হবে না।
উল্লেখ্য: রাগের অবস্থায় তালাক দিলে সাধারণত তা পতিত হয়, যদি রাগ এমন তীব্র না হয় যে মানুষ নিজের কর্ম সম্পর্কে অজ্ঞান হয়ে যায় (যেমন: উন্মাদনার পর্যায়ে)। তবে নিয়তের প্রশ্নটি পৃথক: যদি কিনায়াত শব্দ ব্যবহার করে এবং নিয়ত না থাকে, তবে রাগ থাকলেও তালাক হয় না।
রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৫)-এ এসেছে:
"الغضبان إذا طلق يقع طلاقه إذا كان يعقل ما يقول"
(রাগী ব্যক্তি তালাক দিলে তা পতিত হবে, যদি সে যা বলছে তা বুঝতে পারে।)
— কিন্তু এখানে শর্ত হলো, সে তালাকের নিয়ত করছে। যেহেতু প্রশ্নে নিয়ত নেই বলে উল্লেখ, তাই তালাক পতিত হবে না।
সারসংক্ষেপ
১. "তুমি মুক্ত" বা "মুক্তি দিলাম" হানাফি মাজহাবে কিনায়াত শব্দ।
২. নিয়ত ছাড়া কিনায়াত শব্দে তালাক পতিত হয় না।
৩. আপনার বর্ণিত উভয় ক্ষেত্রেই যদি তালাকের নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।
৪. তবে সতর্কতা হিসেবে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার না করাই ভালো।
উপদেশ: বিবাদ এড়াতে এবং দ্বীনি নিরাপত্তার জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরিষ্কার ভাষায় কথা বলবেন। কোনো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করলে পরে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
والله تعالى أعلم بالصواب