ছোট ছেলেকে জার্সি কিনে দেওয়া প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২। গোনাহ করার সময় বা নিয়ত করার সময় গোনাহ করার ইচ্ছা থাকলে মনে বা ভিতরে ইসলামিক কিছু করার কথা আসলে না করে গোনাহ করলে,গোনাহের নিয়ত করলে বা গোনাহ চলমান থাকলে ইমান চলে যাবে কি?
Answer
প্রশ্নটি দুটি ভাগে বিভক্ত। নিচে ক্রমান্বয়ে উভয় প্রশ্নের উত্তর পবিত্র কুরআন, হাদীস ও নির্ভরযোগ্য হানাফী কিতাবের আলোকে প্রদান করা হলো।
প্রথম প্রশ্ন: সন্তানের জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি কিনে দেওয়া
প্রশ্ন: আমার ৪ বছরের নিচে একটি বাচ্চা আছে। অন্য পোলাপান জার্সি পরে দেখে সে কান্নাকাটি করছে। তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি কিনে দিলে কি গুনাহ হবে? ইমানে কি সমস্যা হবে?
উত্তর:
১. জার্সি পরিধানের হুকুম: যদি জার্সির মধ্যে কোনো অশ্লীল ছবি, ক্রুশ, ধর্মীয় প্রতীক, অমুসলিমদের ধর্মীয় চিহ্ন, অথবা এমন কোনো লোগো/স্লোগান থাকে যা ইসলামী বিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিপন্থী, তাহলে তা পরিধান করা হারাম বা মাকরূহ তাহরীমী হবে।
২. শিশুর অবস্থা: আপনার সন্তানের বয়স ৪ বছরের নিচে। এই বয়সে শিশুটি নেকী-গুনাহের বোঝা বহনের জন্য দায়ী নয় (অর্থাৎ তার আমলনামায় গুনাহ লেখা হয় না)। তবে পিতামাতার জন্য সন্তানের সামনে এমন পোশাক পরা বা তাকে পরানো সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। যদি জার্সিটি এমন কোনো দলের হয় যা ফাসিক বা বেপর্দা সংস্কৃতির প্রতীক, তবে শিশুকে তা পরিয়ে তার সাথে রাস্তায় বের হওয়া বা বড়দের সামনে নিয়ে যাওয়া কিছুটা মাকরূহ হতে পারে।
৩. গুনাহ ও ইমানের সমস্যা: আপনি যদি শুধুমাত্র শিশুর কান্নার কারণে এবং অন্য বাচ্চাদের মতো করে দিতে চান, তাহলে এর দ্বারা আপনার ইমান নষ্ট হবে না। বরং নিয়ত ঠিক রেখে শিশুর শখ পূরণ করা জায়েজ। তবে জার্সিটি যদি হারাম প্রতীকের (যেমন ক্রুশ, শিরকী স্লোগান) হয়, তাহলে তা কিনে দেওয়া বা পরানো গুনাহ হবে এবং তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
সারসংক্ষেপ:
- জার্সিটি যদি সাধারণ খেলাধুলার পোশাক হয় (হারাম প্রতীক ছাড়া), তাহলে শিশুকে কিনে দেওয়া জায়েজ এবং গুনাহ নেই।
- যদি জার্সিতে হারাম বা ধর্মবিরোধী প্রতীক থাকে, তাহলে দেওয়া জায়েজ নয় এবং সেটি গুনাহ হবে।
- ইমান নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই, তবে মাকরূহ বা হারাম কাজ থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী): অমুসলিমদের ধর্মীয় পোশাক বা প্রতীক পরিধান মাকরূহ তাহরীমী। (كتاب الكراهية، الفصل السابع)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): শিশুদের জন্যও হারাম বস্তু কেনা বা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। (ج ١، ص ٥٦٦)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): পোশাকের মধ্যে যদি ইসলামী শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে তা পরিধান করা উচিত নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: গুনাহ করার সময় ইমান চলে যাওয়া
প্রশ্ন: গুনাহ করার সময় বা নিয়ত করার সময় গুনাহ করার ইচ্ছা থাকলে মনে বা ভিতরে ইসলামিক কিছু করার কথা আসলে না করে গুনাহ করলে, গুনাহের নিয়ত করলে বা গুনাহ চলমান থাকলে ইমান চলে যাবে কি?
উত্তর:
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, শুধুমাত্র গুনাহ করলে বা গুনাহের নিয়ত করলে ইমান চলে যায় না। ইমান চলে যাওয়ার জন্য স্পষ্টভাবে ইসলামকে অস্বীকার করা, কুফরী কালেমা বলা, অথবা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল মনে করা প্রয়োজন। তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বুঝতে হবে:
গুনাহের নিয়ত করলে কি হয়?
- হাদীস শরীফে এসেছে, “মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো নেক কাজের নিয়ত করে কিন্তু তা করতে না পারে, তবে তার জন্য একটি নেকী লেখা হয়। আর যদি গুনাহের নিয়ত করে কিন্তু তা না করে, তাহলে তার জন্য কোনো গুনাহ লেখা হয় না। আর যদি করে ফেলে, তবে একটি গুনাহ লেখা হয়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৯১)
- উপসংহার: গুনাহের নিয়ত করলেই গুনাহ হয় না, বরং তা মনে করলে সেটি ইমানের জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে তা থেকে তাওবা করা উচিত।
সতর্কীকরণ ও পরামর্শ:
প্রথম প্রশ্নের জন্য: সন্তানকে এমন জার্সি কিনে দেওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে জার্সিতে কোনো অশ্লীল বা ধর্মীয় প্রতীক নেই। যদি থাকে, তাহলে খোলাসা করে বোঝান বা তাকে অন্য ইসলামী পোশাক কিনে দিন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জন্য: গুনাহ করা কখনোই ছোট জিনিস নয়। প্রতিটি গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং সাথে সাথে তাওবা করা ফরয। গুনাহ করলেই ইমান চলে যাবে এই ভয়ে গুনাহ না করা বা তাওবা না করে ইবাদত ছেড়ে দেওয়া শয়তানের ধোঁকা। বরং গুনাহের পর সাথে সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং পুনরায় গুনাহ না করার প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন। ইমানের উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। (আমীন)