ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন, নববী পদ্ধতি, গণতন্ত্র, দাজ্জাল, জন্মদিনের রোজা, শিশুদের কষ্ট ইত্যাদি নিয়ে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. আমরা ইসলামী শারীয়াহ চাই। তবে সেই শরীয়াহ বাস্তবায়নের পথ কি? গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্ভব না। তাহলে নববী পদ্ধতি কি?
২. শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য একজন সাধারণ মানুষ কতটুকু দায়িত্ব পালন করলে যথেষ্ট? জেনারেল লাইনে পড়ুয়া দায়ীরা এতে কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
২. এখন এই মূহুর্তে আমাদের দেশে শরীয়াহ শাসন সম্ভব না বলে অনেক ইসলামী দল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগাচ্ছে। তাদের ভুলগুলো কি কি?
৩. বোহেমিয়ান আর্টের সাথে কি শয়তান বা ইলুমিনাতির সম্পর্ক আছে? এই আর্ট করায় কি কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে?
৪. দাজ্জাল কি শয়তানের একটা রুপ? নাকি জিন?
৫. রাসূল (স) নিজ জন্মবার উপলক্ষে সোমবার রোজা রাখতেন। আমরাও আমাদের জন্মদিনে এর উদ্দেশ্যে রোজা রাখতে পারি? নামাজ পড়তে পারি? এগুলো কি জন্মদিন উদযাপনের অংশ হবেনা? হারাম হবেনা?
৬. রোগ ব্যাধি, বিপদ হয় গুনাহের কারণে নয় পরীক্ষাস্বরুপ আসে। নাবালক শিশুরা তো নিষ্পাপ, তাদের কেন নানা অসুখ, সমস্যায় কষ্ট পেতে হয়?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين
প্রশ্নকর্তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর হানাফী ফিকহ ও ইসলামী বিশ্বাসের আলোকে নিম্নরূপ দেওয়া হলো। প্রতিটি উত্তর কুরআন, হাদীস ও নির্ভরযোগ্য হানাফী কিতাবের (ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতী জেওর, মাআরিফুল কুরআন, ফাতাওয়া আলমগীরী, আল-হিদায়া, শরহু মাআনিল আসার, উসুলুশ শাশী ইত্যাদি) ভিত্তিতে প্রস্তুত।
১. শরীয়াহ বাস্তবায়নের পথ ও নববী পদ্ধতি
ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন আল্লাহর নির্দেশিত পথেই সম্ভব। গণতন্ত্র একটি মানবরচিত ব্যবস্থা, যা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে প্রাধান্য দেয়—এতে আল্লাহর বিধানকে মানুষের ইচ্ছার অধীন করা হয়। ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফত) সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক, যেখানে শাসকের ক্ষমতা সীমিত এবং তিনি শরীয়াহর অধীন। নববী পদ্ধতি হলো ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আদল (ন্যায়বিচার) ও শূরার মাধ্যমে শাসনকার্য চলে, কিন্তু চূড়ান্ত আইন কেবল আল্লাহর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলিমরা শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য দাওয়াত, সংস্কার ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, তবে গণতন্ত্রকে ইসলামী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ নয়। বরং সুযোগ মতো ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলতে থাকবে।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানী (১/২৫০-২৫৫); ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৫২-১৫৫)।
২. শরীয়াহ বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব
প্রত্যেক মুসলিমের ওপর শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য নিম্নোক্ত দায়িত্ব রয়েছে:
- নিজে দ্বীন মেনে চলা, তাওবা ও ইসলাহ করা।
- পরিবার ও সমাজে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া এবং নেকীর আদেশ ও মুনকার হতে নিষেধ করা।
- ইসলামী শিক্ষা অর্জন ও প্রচার করা।
- সমাজ কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া।
“জেনারেল লাইনের পড়ুয়া দায়ী” অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষিত মুসলিমগণ দ্বীনী ইলম অর্জন করে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে পারেন, ইসলামী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন, এবং প্রকল্পিত খিলাফত বা ইসলামী শাসনের ভিত্তি প্রস্তুত করতে ভূমিকা রাখতে পারেন। কেউ যদি আন্তরিকভাবে দ্বীনের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করে, তাহলে তা যথেষ্ট।
রেফারেন্স: বেহেশতী জেওর (দশম অধ্যায়); রদ্দুল মুহতার (২/৪৬৭-৪৭০)।
৩. গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামী দলগুলোর ভুল
ইসলামী দলগুলো গণতন্ত্রে অংশ নিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুল হয়:
- ইসলামী নীতির সাথে আপস (যেমন সুদ, বেহায়াপনা ইত্যাদি আইন মেনে চলা)।
- আল্লাহর বিধানের চেয়ে জনমতকে প্রাধান্য দেওয়া।
- নির্বাচনী স্বার্থে ইসলামী আকীদায় বাড়াবাড়ি বা শিথিলতা।
- শূরার পরিবর্তে দলীয় নেতৃত্বের একাধিপত্য।
- ইসলামী শাসনের প্রকৃত ধারণা (খিলাফত) থেকে দূরে সরে যাওয়া।
তবে কিছু ইসলামী দল গণতন্ত্রকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু শর্ত হলো তাদের উদ্দেশ্য ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে চলা। কিন্তু সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে ইসলামী পদ্ধতি বলে চালানো ভুল।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানী (২/২৮০-২৮৫); মাআরিফুল কুরআন (সূরা শুরা: ৩৮ এর তাফসীর)।
৪. বোহেমিয়ান আর্ট ও শয়তান/ইলুমিনাতি
বোহেমিয়ান আর্ট বলতে সাধারণত অপ্রচলিত, রীতি-নীতিবহির্ভূত শিল্পকলা বোঝায়। ইসলামী দৃষ্টিকোণে যে কোনো শিল্পকর্ম যদি আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি, অশ্লীলতা, অশোভনতা, মূর্তি পূজা বা শিরকী বিশ্বাসকে উৎসাহিত করে, তবে তা হারাম। ইলুমিনাতি ও শয়তানের সাথে এ ধরনের শিল্পের সম্পর্ক থাকতে পারে, কারণ ইলুমিনাতি একটি গোপন সংগঠন যা বিশ্বব্যাপী নৈতিক অবক্ষয় ও শিরক ছড়ায়। তবে প্রতিটি বোহেমিয়ান শিল্পই শয়তানী নয়; বরং তার উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু দেখতে হবে। যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি অশ্রদ্ধা, অশ্লীলতা বা ফিতনা থাকে, তবে তা করা ও দেখা হারাম।
রেফারেন্স: রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭০-৩৭৫); ফাতাওয়া শামী (৯/৩৪৫)।
৫. দাজ্জাল কি শয়তানের রূপ নাকি জিন?
দাজ্জাল একটি বিশেষ মানব জাতির সৃষ্টি, যে কিয়ামতের বড় ফিতনা। সে শয়তান নয়, জিনও নয়; বরং সে আল্লাহর সৃষ্ট এক মানুষ (কা’ব ইবনে আশরাফ প্রকারের নয়, বরং বিশেষ সৃষ্টি)। হাদীসে এসেছে, দাজ্জাল হবে কানা, তার forehead-এ “কাফ-ফা-রা” লেখা থাকবে যা প্রতিটি মুমিন পড়তে পারবে। সে অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারা লোকদের ধোকা দেবে, কিন্তু তা শয়তানের সহায়তায় নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় পরীক্ষাস্বরূপ। শয়তান তার সহায়ক নয়, বরং সে নিজেই একটি মহা ফিতনা।
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম (কিতাবুল ফিতান); শরহু মাআনিল আসার (৪/২১৫), রদ্দুল মুহতার (১/৫২)।
৬. জন্মদিনে রাসূল (সাঃ)-এর অনুসরণে রোজা ও নামায
প্রশ্ন: ‘রাসূল (সাঃ) নিজ জন্মবার উপলক্ষে সোমবার রোজা রাখতেন; আমরা কি আমাদের জন্মদিনে রোজা রাখতে পারি বা নামায পড়তে পারি? এগুলো কি জন্মদিন উদযাপনের অংশ হবে? হারাম হবে?’
উত্তর: রাসূল (সাঃ) সোমবারে রোজা রাখতেন এ কারণে যে, সোমবার তাঁর জন্মদিন এবং এ দিনেই তাঁর উপর ওহী নাযিল হয় (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)। তিনি এটিকে কৃতজ্ঞতার রোজা হিসেবে রাখতেন, জন্মদিন উদযাপন হিসেবে নয়। আমাদের জন্য নিজ জন্মদিনে রোজা রাখা জায়েজ যদি তা রাসূলের সুন্নাত অনুসরণের নিয়তে হয় এবং তাতে কোনো বিদআতি বিশ্বাস বা জন্মদিন উদযাপনের সংস্কৃতি না থাকে। তবে নামায নির্দিষ্ট দিনে আদায় করা বা জন্মদিনের উদ্দেশ্যে নফল নামায পড়া জায়েজ নয়, কারণ নামায নির্দিষ্ট সময়ের সাথে জড়িত। জন্মদিনে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য রোজা রাখা যেতে পারে, তবে জন্মদিনকে বিশেষ উৎসবে পরিণত করা বা কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালানো ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা নাজায়েজ ও বিদআত। তাই রাসূলের নিয়তের মতো কৃতজ্ঞতার রোজা রাখলে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু জন্মদিনের আয়োজনে তা করলে তা উদযাপনের অংশ হয়ে হারাম হবে।
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম (১১৬২); মিশকাত (২/১২৩); বেহেশতী জেওর (চতুর্দশ অধ্যায়); ফাতাওয়া উসমানী (১/২২০-২২২)।
৭. নিষ্পাপ শিশুদের কষ্টের কারণ
রোগ-বিপদ গুনাহের শাস্তিও হয়, আবার পরীক্ষাও হয়। তবে নাবালক শিশুদের গুনাহ হয় না, বরং তাদের কষ্ট বা রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা স্বরূপ হয়। এর মাধ্যমে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তাদের পিতামাতার জন্য কাফফারা ও পরীক্ষা হয়। হাদীসে এসেছে: “মুসলিমের উপর কোনো কষ্ট, রোগ, দুঃখ-চিন্তা আসে না; এমনকি একটি কাঁটাও বিঁধে না, বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করেন” (মুসলিম: ২৫৭৩)। শিশুরা নিষ্পাপ হলেও তাদের উপর পরীক্ষা আসতে পারে, যা তাদের উচ্চ মর্যাদার কারণ। আর তাদের পিতামাতার ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। এটি আল্লাহর হিকমত (প্রজ্ঞা) ও ন্যায়বিচার।
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী (৫৬৪২); তাফসীর ইবনে কাসীর (সূরা তাগাবুন: ১১); রদ্দুল মুহতার (১/৬৫)।