১৪ সপ্তাহের ভ্রূণ পেটের ভিতর মারা গেলে এর করণীয় কি

Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 1298
Questioner: Afra Aroya
Question Asked: 06 Jun 2026, 03:47 PM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 03:57 PM
Views: 92
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহ। ১৪ সপ্তাহ শেষ এর দিকে ছিল,অর্থাৎ ১ দিন গেলে ১৫ সপ্তাহে পরত।ভ্রূণ পেটের ভিতর মারা গেলে নামাজ এর নিয়ম কি। এটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি ইন শা আল্লাহ। ভিতরে ভ্রূণের কিছু অংশ আছে এটা বের করার জন্য ওষুধ চলছে। ১৪ সপ্তাহ শেষ এর দিকে ছিল কিন্তু ভ্রূণের বৃদ্ধির হয়নি হয়তো

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, আপনার সন্তানের জন্য আমি গভীরভাবে সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দান করুন এবং এর বিনিময়ে জান্নাতে উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন।

আপনার প্রশ্নটি মূলত গর্ভপাতের পর নারীর পবিত্রতা ও নামাজের হুকুম নিয়ে। নিচে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সালাফি স্কলারদের মতামতের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:

ভ্রূণ মৃত অবস্থায় বের হলে নামাজের বিধান কী?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ভ্রূণটি ১৪ সপ্তাহ শেষের দিকে ছিল (অর্থাৎ প্রায় পূর্ণ ১৪ সপ্তাহ) এবং এটি মৃত অবস্থায় পেটের ভিতরে থাকে, এখন ওষুধের মাধ্যমে তা বের করার প্রক্রিয়া চলছে। এই অবস্থায় যে রক্তস্রাব হবে, তা নিফাস (প্রসবোত্তর রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে, যদি ভ্রূণটি মানবাকৃতিতে স্পষ্ট হয়।

মূলনীতি:

ইসলামী ফিকহে, গর্ভপাতের পর যে রক্তস্রাব হয়, তা নিফাস গণ্য হওয়ার শর্ত হলো—ভ্রূণটি ৮১ দিন (প্রায় ১২ সপ্তাহ) বা তার বেশি বয়সের হয় এবং তাতে মানবাকৃতির কোনো অংশ (যেমন হাত, পা, মাথা ইত্যাদি) স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"গর্ভপাতের পর যে রক্ত আসে, তা যদি ভ্রূণটির মধ্যে মানুষের আকৃতি স্পষ্ট হয়, তাহলে তা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তা নিছক রক্তপিণ্ড (নুৎফা বা আলাক্বাহ) হয়, তাহলে তা নিফাস নয়, বরং ইস্তিহাযা (অবিরত রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে।"
(মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২২/২৫২)

শায়খ মুহাম্মদ ইবন সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:

"যদি ভ্রূণটি পূর্ণ ৮০ দিনের বেশি হয় এবং তাতে মানুষের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (যেমন হাত, পা বা মাথা) স্পষ্ট হয়, তাহলে তা নিফাস গণ্য হবে, যদিও তা অপরিণত অবস্থায় বের হয়। আর যদি তা ৮০ দিনের কম হয় এবং শুধু রক্তপিণ্ড বা মাংসপিণ্ড হয়, তাহলে তা নিফাস নয়, বরং রক্তস্রাব ইস্তিহাযা।"
(আশ-শারহুল মুমতি‘, ১/৪১২)

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হুকুম:

  • যেহেতু ভ্রূণটি ১৪ সপ্তাহের কাছাকাছি (প্রায় ৯৮ দিন), সুতরাং এতদিনে সাধারণত ভ্রূণের হাত-পা, মাথা ইত্যাদি স্পষ্ট হয়। তাই আপনার ক্ষেত্রে যে রক্তস্রাব হবে, তা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে।
  • নিফাসের সময় আপনি নামাজ, রোজা ও স্বামীর সাথে সহবাস থেকে বিরত থাকবেন। নিফাসের সর্বোচ্চ সময়কাল ৪০ দিন (ইমাম আহমাদ ও অধিকাংশ সালাফের মতে, সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে ৪০ দিন পর্যন্ত নিফাসের হুকুম প্রযোজ্য)।
  • নিফাস শেষ হলে (রক্ত বন্ধ হলে) আপনি গোসল করে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত শুরু করবেন।

ভ্রূণের অংশ বের করার জন্য ওষুধ চলছে—এই সময়ে নামাজের হুকুম:

ওষুধ সেবনের ফলে যে রক্তস্রাব হচ্ছে, সেটি নিফাসের রক্ত। তাই এই রক্ত চলাকালীন সময়ে নামাজ পড়া জায়েজ নয়। আপনার জন্য নামাজ ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক। পরে রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজের কাজা আদায় করতে হবে না (নিফাসের রক্ত চলাকালে ছেড়ে দেওয়া নামাজের কাজা নেই)।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম (যদি ভ্রূণের বৃদ্ধি না হয়):

আপনি বলেছেন "ভ্রূণের বৃদ্ধির হয়নি হয়তো"। যদি চিকিৎসক নিশ্চিত করেন যে, ভ্রূণটি সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়নি এবং এটি নিছক রক্তপিণ্ড বা মাংসপিণ্ড (যাতে মানুষের কোনো অঙ্গ স্পষ্ট নয়), তাহলে সেটা নিফাস নয়। সেক্ষেত্রে রক্তস্রাব ইস্তিহাযা (অবিরত মাসিক রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে এবং আপনার উপর নামাজ ও রোজা ফরয থাকবে। তবে ওষুধের কারণে যদি রক্তস্বল্পতা বা শারীরিক দুর্বলতা থাকে, তাহলে আপনি নামাজ বসে বা ইশারায় আদায় করতে পারেন।

এ বিষয়ে সালাফি স্কলারদের ফতোয়া:

শায়খ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"গর্ভপাতের পর যদি ভ্রূণটি ৮০ দিনের বেশি হয় এবং তাতে মানুষের আকার-আকৃতি স্পষ্ট থাকে, তাহলে তা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তার চেয়ে কম হয়, তাহলে তা নিফাস নয়, বরং ইস্তিহাযা।"
(মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ১০/২২৩)

শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: "এক নারীর ৪ মাসের গর্ভপাত হয়েছে, তার কী করণীয়?" উত্তরে তিনি বলেন:

"এটি নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। সে নামাজ ও রোজা ছেড়ে দেবে এবং রক্ত বন্ধ হলে গোসল করবে।"
(সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর, টেপ নং ৫৩৬)

আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ:

  1. আপনি গাইনোকোলজিস্টের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন যে ভ্রূণটির বয়স কত এবং তাতে মানুষের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হয়েছিল কিনা। সাধারণত ১৪ সপ্তাহে ভ্রূণের হাত-পা, আঙুল, চোখ ইত্যাদি স্পষ্ট হয়।
  2. যদি ডাক্তার নিশ্চিত করে যে ভ্রূণটি গঠিত হয়েছিল, তাহলে আপনার বর্তমান রক্ত নিফাস। এই অবস্থায় আপনি নামাজ, রোজা থেকে বিরত থাকবেন। রক্ত চলাকালে কুরআন তিলাওয়াত করা (মুসহাফ স্পর্শ না করে) জায়েজ আছে।
  3. রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করে স্বাভাবিক ইবাদতে ফিরে আসবেন। মনে রাখবেন, নিফাসের সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিন। এর বেশি হলে তা ইস্তিহাযা (শেষ ৪০ দিনের অতিরিক্ত রক্ত ইস্তিহাযা)।

সারসংক্ষেপ:

  • ১৪ সপ্তাহের ভ্রূণ: মানুষের আকৃতি স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। তাই এটি নিফাস গণ্য হবে।
  • নামাজ: নিফাসের রক্ত চলাকালে নামাজ পড়া হারাম। পরে কাজা নেই।
  • ওষুধ চলছে: ওষুধের কারণে যে রক্ত আসছে, তা নিফাসের অংশ। তাই নামাজ থেকে বিরত থাকুন।
  • যদি ভ্রূণটি না গঠিত হয়: তবে তা ইস্তিহাযা। সেক্ষেত্রে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের জন্য অযু করে নামাজ পড়বেন এবং রক্ত কাপড়ে লাগলেও নামাজ সহিহ হবে (যদি কাপড় নাপাক না করা যায়, তবে নামাজের সময় পরিবর্তন করে নেওয়া জরুরি)।

আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ইবাদত কবুল করুন এবং আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি আপনার ডাক্তারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং শরয়ি বিধান মেনে চলুন। কোনো জটিলতা বা দ্বিধা থাকলে নিকটস্থ আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

রেফারেন্স:

  • সূরা আল-হজ্জ: ৫ (মানুষের সৃষ্টির স্তর সম্পর্কে)
  • সহিহ বুখারী ও মুসলিম (নিফাসের হাদিস)
  • মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়্যাহ (২২/২৫২)
  • আশ-শারহুল মুমতি‘ (১/৪১২)
  • ফাতাওয়া ইবন বায (১০/২২৩)

আল্লাহু আলাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.