ঈমান সংক্রান্ত
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, শির্ক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা বা এমন বিশ্বাস পোষণ করা যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। তাই তাবিজ-কবচ, ঝাড়-ফুঁক, বা কারো মাধ্যমে অদৃশ্য বিষয় জানার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
১. তাবিজ ও বশীকরণের বিধান
-
তাবিজ: যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা সহীহ দু‘আ লেখা হয় এবং তা পরিধানকারী আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি তাবিজে শিরকী কালাম, জিন-ভূতের নাম বা অলীক বস্তু থাকে, তাহলে তা হারাম ও শির্ক।
(আল-হিদায়া, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, রদ্দুল মুহতার) -
বশীকরণ (তাবিজ বা জাদু দ্বারা কাউকে নিয়ন্ত্রণ): ইসলামে যাদু-টোনা ও বশীকরণ সম্পূর্ণ হারাম এবং কবীরা গুনাহ। কাউকে তাবিজ করে বশ করানো বা নিজে বশ করার চেষ্টা করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি নির্ভরতা ও বিশ্বাস জড়িত।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া উসমানী)
২. ‘হুজুরের মাধ্যমে’ কারো তাবিজে বশ হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা
এখানে ‘হুজুর’ (আলেম বা পীর) বলতে সাধারণত একজন দ্বীনদার ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। এখন প্রশ্ন হলো—তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে কি তা শির্ক হবে?
-
যদি হুজুর দাবি করেন তিনি অদৃশ্য জানেন (ইলমুল গায়েব) অথবা আপনারা এমন বিশ্বাস রাখেন যে তিনি স্বতন্ত্রভাবে কারো ভাগ্য বা তাবিজের প্রভাব জানতে পারেন, তাহলে তা শির্কি গুনাহ হবে। কারণ অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল আল্লাহর।
(সূরা আন‘আম ৬:৫৯, সূরা লোকমান ৩১:৩৪) -
কিন্তু যদি হুজুর শুধুমাত্র দু‘আ, ইস্তিখারা, কুরআন তেলাওয়াত, বা শরী‘আত সম্মত পদ্ধতিতে (যেমন ঝাড়-ফুঁক, কুরআনের আয়াত পড়ে) অনুমান করেন বা পরামর্শ দেন, এবং আপনিও বিশ্বাস করেন যে তাঁর মাধ্যমে আল্লাহই জানাচ্ছেন বা তিনি শুধু মাধ্যম, তবে তা জায়েয এবং শির্ক নয়। কারণ এটা ‘তাওয়াসসুল’ বা শরী‘আত সম্মত মাধ্যম গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত।
(ফাতাওয়া উসমানী, মাআরিফুল কুরআন) -
সতর্কতা: সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক সময় অজ্ঞতাবশত আলেম-পীরকে ‘আল্লাহর মতো জ্ঞানী’ মনে করার প্রবণতা থাকে। এটি কুফরী বিশ্বাস। তাই জিজ্ঞেস করার সময় মনের নিয়ত পরিষ্কার রাখা জরুরি—হুজুর শুধু দু‘আ করবেন বা কুরআন পড়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবেন, তিনি নিজে অদৃশ্য জানেন না।
৩. প্রধান হানাফী রেফারেন্সে বক্তব্য
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): জাদু ও তাবিজের মাধ্যমে কারো ওপর প্রভাব ফেলা হারাম এবং তা শির্কের পর্যায়ভুক্ত যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতিও নির্ভরতা থাকে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী): কুরআন-সুন্নাহ সম্মত তাবিজ জায়েয, তবে বশীকরণ বা জাদুকারীকে ‘অদৃশ্য জ্ঞাতা’ মনে করা শির্ক।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): কোনো আলেমের কাছে অদৃশ্য জানার আশায় যাওয়া নয়, বরং শরী‘আত সম্মত পদ্ধতিতে সমাধান চাওয়া জায়েয। তবে যে নিজেকে ‘গায়েব জানা’ বলে দাবি করে, তার কাছে যাওয়া নাজায়েয।
৪. আপনার জন্য পরামর্শ
- কারো তাবিজ-বশ হয়েছে কিনা, তা সরাসরি জিজ্ঞেস না করে বরং আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন, কুরআন তেলাওয়াত করুন এবং একজন দ্বীনদার আলেমের নিকট কুরআন-সুন্নাহ সম্মত ঝাড়-ফুঁক বা দু‘আর জন্য যান।
- মনে রাখবেন, প্রকৃত সমাধান একমাত্র আল্লাহর কাছে। কোনো হুজুর বা পীর যদি নিজেকে ‘গায়েব জানা’ বলে দাবি করেন, তার থেকে দূরে থাকা উচিত।
সারসংক্ষেপ:
কাউকে তাবিজ করে বশ করা হয়েছে কিনা, এটা কোনো হুজুরের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলে যদি সেই হুজুর শরী‘আত সম্মত পদ্ধতিতে (দু‘আ ও কুরআন পাঠের মাধ্যমে) মতামত দেন এবং আপনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখেন, তাহলে তা শির্ক নয়। কিন্তু যদি হুজুর দাবি করেন তিনি নিজ থেকে অদৃশ্য জানেন, অথবা আপনি তাঁকে ‘অদৃশ্য জ্ঞাতা’ মনে করেন, তাহলে তা শির্কি গুনাহ হবে।
والله أعلم بالصواب
আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।